বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর যখন ১৯ বছর বয়সি স্প্যানিশ তরুণ লামিনে ইয়ামাল অশ্রুসিক্ত লিওনেল মেসিকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন ফুটবল বিশ্ব এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো। এটি কেবল সান্ত্বনার কোলাকুলি ছিল না, বরং ছিল বিশ্বফুটবলের রাজদণ্ড এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তরের প্রতীক।
নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক যখন ৩৯ বছর বয়সি মেসির নাম ধরে চিৎকার করছিলেন, তখন হয়তো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়ক তার শেষ বিশ্বকাপ মঞ্চকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। আর ঠিক সে মুহূর্তে বার্সেলোনার বর্তমান ১০ নম্বর জার্সিধারী ইয়ামাল জড়িয়ে ধরলেন ক্লাবটির ইতিহাসের সবচেয়ে কিংবদন্তি ১০ নম্বরকে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের র্যাফেলের অংশ হিসেবে ২০ বছর বয়সি মেসির কোলে থাকা ছয় মাসের শিশু ইয়ামালের সেই ভাইরাল ছবিটির বৃত্ত যেন আজ সম্পূর্ণ হলো। সেই শিশুটিই আজ বিশ্বজয়ী পুরুষ।
দুবছর আগে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেনের ইউরো জয়ের নায়ক ইয়ামাল এবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে একপ্রকার ‘পূর্ণতা’ দিলেন। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট কাটিয়ে টুর্নামেন্টে খেলতে আসা এই তরুণ মাত্র ১৯ বছর ছয়দিন বয়সে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একইসঙ্গে বিশ্বকাপ ও ইউরো জয়ের অনন্য কীর্তি গড়লেন।
ফাইনালের মঞ্চে ইয়ামালের উপস্থিতি ছিল স্পেনের নিখুঁত ও নান্দনিক কৌশলের মূল ভিত্তি। বিপরীতে আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক ও শারীরিক শক্তি প্রদর্শনের কৌশল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। স্পেনের হয়ে খেলা ২৮টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের একটিতেও হারেননি ইয়ামাল। তাছাড়া বড় টুর্নামেন্টে মূল একাদশে থেকে টানা ১৩ ম্যাচ জেতার রেকর্ড গড়েছেন, যা ইউরোপীয় ফুটবলে আর কোনো খেলোয়াড়ের নেই। পেলে (১৯৫৮), জিউসেপ্পে বার্গোমি (১৯৮২) এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের (২০১৮) পর ইতিহাসের মাত্র পঞ্চম তরুণ হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মূল একাদশে খেলে শিরোপা জেতার গৌরব অর্জন করলেন ইয়ামাল ও তার সতীর্থ পাউ কুবার্সি।
আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকোসহ প্রতিপক্ষের চরম শারীরিক ও মানসিক চাপ উড়িয়ে দিয়ে মাঠে শান্ত ছিলেন ইয়ামাল। তার এই পরিপক্বতা দেখে ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক ও বিবিসি স্পোর্টসের পণ্ডিত জো হার্ট বলেন, ‘লামিনে ইয়ামাল কেবল প্রতিক্রিয়াই দেখায়নি, সে বুক চিতিয়ে লড়েছে। পুরো দল তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শান্ত ছিল সে। ১৯ বছর বয়সেই সে ফুটবলকে পূর্ণতা দিয়েদিল।’
অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে স্পেনের নতুন এই সোনালি অধ্যায় লেখা হয়েছে। ম্যাচ শেষে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ইয়ামালের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘ও দারুণ ফুটবল খেলেছে, যা তাকে আরো পরিপক্ব হতে সাহায্য করবে। দলের জন্য ও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে।’
রদ্রিগোর মতো অভিজ্ঞ অধিনায়কের ছায়ায় এবং নিজের অবিশ্বাস্য প্রতিভায় ভর করে ১৯ বছর বয়সেই ইয়ামাল বিশ্বজয় করেছে। ক্যারিয়ারের একদম শুরুতে দাঁড়িয়ে থাকা এই তরুণের সামনে যে আরো কত সাফল্য অপেক্ষা করছে, তা সময়ই বলে দেবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

