পেনাল্টি মিসের রাগকে গোল বানালেন মেসি

Picsart_26-06-04_12-40-53-266
এম. এম. কায়সার

পেনাল্টি মিসের রাগকে গোল বানালেন মেসি


পেনাল্টি মিস করার পর লিওনেল মেসি মাথা নিচু করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে ছিলেন। একবার আকাশের দিকে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে খানিকটা শূন্যতা ছিল। ডালাসের আর্লিংটনের এটি অ্যান্ড টি স্টেডিয়ামে তখন হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থকের বুকে কাঁপন। বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলরেকর্ড ভাঙার ম্যাচ। অথচ সুযোগ এসেও হারিয়ে গেল! ম্যাচ শেষে নিজের খেলার বিশ্লেষণে মেসি নিজেই বললেন, ‘আমি নিজের ওপর খুব রাগান্বিত ছিলাম।’
এই একটি বাক্যই হয়তো বলে দেয় কেন ৩৮ বছর বয়সেও তিনি অন্যদের মতো নন। অনেক ফুটবলার ভুল থেকে হতাশ হয়। মেসি ভুল থেকে আগুন তৈরি করেন। আর সেই আগুনেই সোমবার রাতে পুড়ে ছাই হয়ে গেল মিরোস্লাভ ক্লোসার বহুদিনের অটুট রেকর্ড।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে দুটি গোলই করলেন মেসি। প্রথমটিতে তৈরি হলো ইতিহাস, নতুন ইতিহাস। দ্বিতীয় গোলে তৈরি হলো সুখকর স্মৃতি। এই দুই গোলের বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়াল ১৮। গেল বিশ্বকাপ আর চলতি বিশ্বকাপ মিলিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে টানা ছয় ম্যাচে গোলের কীর্তিনামায় ভাগ বসালেন মেসি। পরের ম্যাচে গোল করতে পারলেই হবে টানা সাত ম্যাচে গোল। যে কীর্তি এখন পর্যন্ত কারো নেই। সেই অনন্য মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে এখন মেসি।
তথ্যটা মুখস্থ করে নিন। কুইজে কাজে লাগতে পারে! বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা কে?
উত্তর : লিওনেল মেসি।
একসময় মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলকে অমর মনে হতো। চারটি বিশ্বকাপ, দীর্ঘ এক ক্যারিয়ার, অসাধারণ ধারাবাহিকতা- সব মিলিয়ে সেই রেকর্ডকে ধরাছোঁয়ার বাইরে মনে করা হতো। কিন্তু মেসির ক্যারিয়ারটাই তো অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে রেকর্ড স্পর্শ করেছিলেন। এবার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুই গোল করে বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকার শীর্ষে মেসি। আর আর্জেন্টিনা টানা দুই ম্যাচ জিতে ছয় পয়েন্ট পকেটে নিয়ে নাম লেখালো নকআউট রাউন্ডে।
এই সাফল্যের কাহিনি শুরু ডালাসে সোনাঝরা রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরে। পেনাল্টি মিস দিয়ে যে গল্পের শুরু। আর রেকর্ড ভাঙা দিয়ে শেষ। মাঝখান জুড়ে পুরো ম্যাচে সবুজ মাঠের ক্যানভাসে এক ফুটবল জাদুকর তার বাঁপায়ের তুলির আঁচড়ে আঁকলেন শৈল্পিক ফুটবল।
৩৮ মিনিটে যে গোলটি তিনি করলেন, সেটি ছিল আর্জেন্টাইন ফুটবলের সৌন্দর্যের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। গোলকিপারকে ভুলপথে পাঠিয়ে কাছের পোস্টে বল জড়ালেন এমন নিখুঁতভাবে, যেন ব্যাপারটা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ। পুরো গোলের ছবিটা ঠিক এমন- আলমাদা, মেদিনা, আবার আলমাদার ডামি— তারপর মেসি। শট নেওয়ার আগে গোলকিপারকে ভুলপথে পাঠিয়ে কাছের পোস্টে বল জড়ানোটা ছিল খাঁটি শিল্প। আর সেই শিল্পের মাধ্যমেই জন্ম নিল নতুন বিশ্বরেকর্ড। মিরোস্লাভ ক্লোসা চারটি বিশ্বকাপ খেলে করেছিলেন ১৬ গোল। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই রেকর্ড হয়তো অমর হয়ে থাকবে।
কিন্তু ডালাসে দাঁড়িয়ে মেসি প্রমাণ করলেন, অমর বলে কিছু নেই। বিশ বছর ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে যাওয়া এই মানুষটি এখনো ম্যাচের ভাগ্য একাই বদলে দিতে পারেন। এটাই তার শ্রেষ্ঠত্ব। এটুকু নয় আরো আছে। মেসির আসল সৌন্দর্যটা এলো ইনজুরি সময়ে।
অস্ট্রিয়া তখন মরিয়া হয়ে সমতা খুঁজছে। ফলে পেছনে জায়গা তৈরি হয়েছে। সেই ফাঁকা মাঠে মেসি যেন সময়কে পেছনে ফেলে দিলেন। ডিফেন্ডার, গোলকিপার আর ডিফেন্ডারের শেষ চেষ্টা— সবকিছু অতিক্রম করে বল পাঠালেন জালে। গোলটি শুধু ম্যাচ শেষ করেনি, একটি সত্যও প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বিশ্বকাপ এখনো মেসির। আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত দুটি ম্যাচ খেলেছে। করেছে পাঁচ গোল। পাঁচটিই মেসির। দুটি ম্যাচেই ম্যাচসেরা।
এমন পরিসংখ্যান সাধারণত ভিডিও গেমে দেখা যায়, বাস্তবে নয়।
তবু আর্জেন্টিনার গল্প শুধু মেসির গল্প নয়।
এই দলের ভেতরে অনেক শক্তি আছে। এনজো ফার্নান্দেজ মাঝমাঠের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করছেন অসাধারণভাবে। রদ্রিগো দে পল এখনো দলের অদৃশ্য ইঞ্জিন। ম্যাক অ্যালিস্টার আক্রমণ ও মাঝমাঠের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়ে দিচ্ছেন। রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ রক্ষণে ক্রমশ আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছেন।
কিন্তু কিছু প্রশ্নও রয়ে গেছে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দীর্ঘ সময় আর্জেন্টিনা প্রেসিংয়ের চাপে ছিল। বলের গতি বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। মাঝেমধ্যে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় চিন্তা আক্রমণে।
জুলিয়ান আলভারেজ ছাড়া পেছনের ফাঁকা জায়গায় নিয়মিত দৌড় দেওয়ার মতো খেলোয়াড় খুব বেশি নেই। লাউতারো মার্টিনেজ বক্সের স্ট্রাইকার, মেসি এখন আর আগের মতো ৫০ গজ দৌড়ান না।
ফলে অনেক সময় আর্জেন্টিনার আক্রমণ ধীর হয়ে যায়। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এটি সমস্যার কারণ হতে পারে। তবে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তিটাও সেখানেই। যখন খেলা আটকে যায়, যখন পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, যখন প্রতিপক্ষ সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়— তখনও তাদের কাছে একজন আছেন, যিনি বন্ধ দরজার ভেতর থেকেও পথ বের করতে পারেন।
তার নাম লিওনেল মেসি।
আজ বুধবার তার ৩৯তম জন্মদিন। ফুটবল ইতিহাসে খুব কম খেলোয়াড়ই এই বয়সে বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন। আরো কম খেলোয়াড় আছেন, যারা এই বয়সে নতুন রেকর্ড গড়েছেন। ডালাসের আর্লিংটন শহরের রাত তাই শুধু একটি ম্যাচ জয়ের গল্প নয়।
এটি এক মানুষের গল্প, যিনি এখনো নিজের ভুল ক্ষমা করেন না। যিনি পেনাল্টি মিসের রাগকে গোলে বদলে দেন। আর যিনি বারবার মনে করিয়ে দেন- ফুটবলে কিছু নামকে থামানো যায় না।
তাদের শুধু দেখা যায়। নয়ন মেলে মুগ্ধ হয়ে।
সেই নামটা লিওনেল মেসি, ওয়ান অ্যান্ড অনলি!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন