হালান্ড, ঘুমন্ত দৈত্যের জেগে ওঠা

c43f2031-a2c6-4b68-9d2e-b872b4482a0e-02-03
আরিফুল হক বিজয়

হালান্ড, ঘুমন্ত দৈত্যের জেগে ওঠা

একসময় ইউরোপের আকাশে তাকে দেখে মনে হতো, এই ছেলেটা যেন গোল করার জন্যই জন্মেছে। গোলপোস্ট তার কাছে ছিল না কোনো কাঠের ফ্রেম; ছিল শিকারের গন্ধ পাওয়া এক বনভূমি। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বিশ্বকাপে বরাবরই তার জন্য ছিল বন্ধ দরজা। নরওয়েই তো পৌছাতেই পারতো না ‘গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’-এ। আর্লিং হালান্ডের পায়ের ঝলকে তখন রোশনাই ঝরতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ থেকে প্রিমিয়ার লিগে। অথচ বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার নামের পাশে ছিল এক বিশাল শূন্যতা। সেই শূন্যতার ভেতরেই যেন ঘুমিয়ে ছিল এক দৈত্য। ঘুম ভেঙ্গেছে তিন দেশের উন্মাদনার সুরে। যে সুরের ছন্দে ছুটছেন নরওয়ের ভাইকিংস।

বিশ্বকাপ মানেই মেসি, রোনালদো, নেইমার ও এমবাপ্পেদের মঞ্চ। হালান্ড ছিলেন দর্শক। টেলিভিশনের পর্দায় অন্যদের উৎসব দেখেছেন, নিজের দেশের ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস শুনেছেন। কতবার যে তাকে প্রশ্ন শুনতে হয়েছে—‘তুমি এত বড় স্ট্রাইকার, অথচ বিশ্বকাপে নেই?’ সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি মুখে দেননি। জমিয়ে রেখেছিলেন নিজের বুটে।

বিজ্ঞাপন

উত্তরটা শুরু করেছিলেন বাছাই পর্বে। ৮ ম্যাচে ১৬ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট, নরওয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে। সেই সঙ্গে হালান্ড বনে গেলেন যেকোনো মহাদেশের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেই সর্বোচ্চ গোলদাতা! এই পথ এসে মিশে গেল দক্ষিণ আমেরিকার প্রান্তরে। কিন্তু থামলেন না হালান্ড।

প্রথম ম্যাচেই বোঝা গিয়েছিল, তিনি শুধু খেলতে আসেননি; ইতিহাসের পাতায় নিজের অধ্যায় লিখতে এসেছেন। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাঁধে হাত রেখে নয়, কাঁধ ভেঙে এগিয়ে গেছেন। গতি, শক্তি কিংবা ট্যাকলেও আটকানো যায়নি আকাশ ছোঁয়া ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির দৈত্যকে! একের পর এক গোল যেন জমে থাকা ক্ষুধারই বহিঃপ্রকাশ।

কেউ কেউ বলে, স্ট্রাইকাররা নাকি গোলে বাঁচে। হালান্ড যেন তারও এক ধাপ ওপরে। তিনি গোল করেন না, গোলকে নিজের ভাষা বানিয়ে ফেলেন। একটি হেড, একটি বাঁ-পায়ের শট, একটি কাউন্টার অ্যাটাক—প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয়, তিনি ডিফেন্ডারদের সঙ্গে নয়, সময়ের সঙ্গে দৌড়াচ্ছেন। ৭ গোলে বসে গেছেন মেসি ও এমবাপ্পের কাতারে। আর কয়েকটি ধাপ, হালান্ডের সামনে চ্যালেঞ্জ।

নরওয়ের এই পথচলা একটি জাতির কয়েক যুগ অপেক্ষার গল্প। ১৯৯৮ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউটে নিজেদের দেখা পায়নি তারা। প্রজন্ম বদলেছে, কোচ বদলেছে, স্বপ্ন ভেঙেছে। কিন্তু এবার সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন লম্বা এক স্বর্ণকেশী যুবক, যার চোখে ভয় নেই, কেবল স্বপ্নীল ছায়া।

ব্রাজিলের বিপক্ষে ছায়া থেকে বেরিয়ে আলো ছড়ালেন হালান্ড। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে তিনি শুধু গোল করেননি; তাদের আত্মবিশ্বাসও ভেঙে দিয়েছেন। প্রথমে নিখুঁত এক হেড, তারপর শেষ মুহূর্তে ঠান্ডা মাথার ফিনিশ। তার দ্বিতীয় গোলটা বাস্তবেই দৈত্যের রূপ প্রকাশ করলো; ঘণ্টায় ১২৮ কিলোমিটার গতির সেই শটের আগে ঝাঁপ দিতে পারেননি ব্রাজিলের অতন্দ্র প্রহরী আলিসন বেকার। হালান্ড যেন বলতে চাইলেন, ‘ফুটবলের নতুন যুগে আমিও আছি।’

ব্রাজিল বিদায় নিল। নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দা নামল। আর সেই রাতেই আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল হালান্ড নামের নতুন নক্ষত্র। তবে হালান্ডের গল্পকে শুধু গোলের অঙ্কে মাপা অন্যায় হবে। এই বিশ্বকাপে তিনি বদলে গেছেন। গোলমুখী স্ট্রাইকারের পাশাপাশি এখন দেখা যাচ্ছে একজন নেতা। সামনে থেকে প্রেস করছেন, সতীর্থদের উৎসাহ দিচ্ছেন, প্রয়োজনে মাঝমাঠ পর্যন্ত নেমে বল কাড়ছেন। তার প্রতিটি দৌড়ে বোঝা যায়, তিনি শুধু নিজের গোল্ডেন বুটের জন্য খেলছেন না; নরওয়ের পতাকাটাকে আরও কয়েকদিন উড়িয়ে রাখতে চাইছেন। তার প্রতিটি গোলের পর উদযাপনে অহংকারের চেয়ে কৃতজ্ঞতাই বেশি দেখা যায়।

বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি এখন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটছেন। তিনজনের গোলসংখ্যা সমান। কিন্তু হালান্ডের গল্প আলাদা। কারণ, অন্য দুজনের বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা ছিল বহু বছরের। আর তিনি এসেছেন প্রথমবার, যেন বহুদিনের আটকে থাকা নদী একসঙ্গে সব বাঁধ ভেঙে ছুটছে আপন স্রোতের টানে।

ফুটবল মাঝে মাঝে রূপকথা লেখে। কিন্তু হালান্ডের গল্প রূপকথা নয়। এটা অপেক্ষার গল্প। অপূর্ণতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের গল্প। যে গল্পের সারাংশ- আলো থেকে যতদিন দূরেই থাকো না কেন, সময় এলে নিজেকেই সূর্য হয়ে উঠতে হয়। একসময় বিশ্বকাপ তাকে মিস করেছে, এখন বিশ্বকাপ তাকে দেখছে। তার প্রতিটি গোলের সঙ্গে মনে হচ্ছে, এতদিন যে দৈত্যটি ঘুমিয়ে ছিল, সে আর ঘুমাতে রাজি নয়। সে বয়ে নিয়ে চলছে একটি জাতির ভার। তার সামনে এখনও পথ বাকি। যে পথের শেষ প্রান্তে অপেক্ষার সোনালি ট্রফি।

হালান্ডের চোখে এখন সেই স্বপ্নটাই জ্বলছে। ফুটবল বিশ্ব বিস্ময়ে দেখছে—এক ঘুমন্ত দৈত্যর জেগে ওঠে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...