ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের কোনো খেলা নয়; এটি মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় মেলবন্ধনের উৎসব। আর এই উৎসবের সর্বোচ্চ চূড়াটি হলো ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল। কোটি কোটি চোখ যখন একটি সবুজ গালিচায় স্থির হয়ে থাকে, তখন সেখানে কেবল ট্রফি জয়ের লড়াই হয় না; রচিত হয় অমরত্ব আর ট্র্যাজেডির মহাকাব্য। ১৯৩০ থেকে ২০২২—৯২ বছরের পথচলায় এমন কিছু ফাইনাল এসেছে, যা ফুটবল খেলাটির গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছে। ফুটবল রোমান্টিকদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে নেওয়া এমন ১০টি ঐতিহাসিক ফাইনাল ম্যাচ নিয়ে এই বিশেষ বিশ্লেষণ—
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফুটবলের নতুন সূর্য (১৯৩০)
মন্টেভিডিওর সেন্সেনারিও স্টেডিয়ামে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালটি ছিল এক চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথমার্ধে ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয়ার্ধে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায় স্বাগতিক উরুগুয়ে। ৪-২ গোলের সেই জয় কেবল উরুগুয়েকে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট দেয়নি, বরং বিশ্ববাসীকে বুঝিয়েছিল—ফুটবল নামের এই নতুন উন্মাদনা বিশ্বজুড়ে সীমান্ত ছাপিয়ে এক নতুন আবেগের জন্ম দিতে যাচ্ছে।
১৭ বছরের এক কিশোর ও সাম্বা বিপ্লব (১৯৫৮)
সুইডেনের মাঠে ১৯৫৮ সালের ফাইনালটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাঁক বদল। মাত্র ১৭ বছর বয়সি এক কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর—পেলে, নিজের জাদুকরী পায়ের ছোঁয়ায় ফুটবলকে এক শিল্পে রূপ দিলেন। সুইডেনকে ৫-২ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে ব্রাজিল তাদের প্রথম বিশ্বকাপ জেতে। এই ফাইনাল থেকেই বিশ্ব ফুটবল পরিচিত হয় ‘জোগা বোনিতো’ বা সুন্দর ফুটবল দর্শনের সঙ্গে।
গ্যারিঞ্চার একক সাম্রাজ্য (১৯৬২)
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ট্র্যাজেডি ছিল টুর্নামেন্টের শুরুতেই পেলের ইনজুরি। কিন্তু ব্রাজিলের ফুটবলীয় গভীরতা কতখানি, তা প্রমাণ করেছিল ১৯৬২ সালের ফাইনাল। পেলের অনুপস্থিতিতে দলের হাল ধরেন ‘বাঁকা পায়ের জাদুকর’ গ্যারিঞ্চা। ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ইতালি ও উরুগুয়ের পর তৃতীয় দল হিসেবে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়ে ব্রাজিল।
ফুটবল যখন ‘ঘরে’ ফিরল (১৯৬৬)
লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে ১৯৬৬ সালের ফাইনালটি আজও ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ও রোমাঞ্চকর ম্যাচ। পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচে জিওফ হার্স্টের সেই বিখ্যাত (এবং বিতর্কিত ‘লাইন ক্রস’ করা) গোলসহ হ্যাটট্রিকে ৪-২ ব্যবধানে জেতে ইংল্যান্ড। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জন্মভূমি প্রথম এবং শেষবারের মতো বিশ্বজয়ের স্বাদ পায়।
নিখুঁত সাম্বা ফুটবলের শেষ প্রদর্শনী (১৯৭০)
মেক্সিকোর মাঠে ১৯৭০ সালের ফাইনালকে বলা হয় রোমান্টিক ফুটবলের চূড়ান্ত রূপ। পেলে, জাইরজিনহো, তোস্তাও ও কার্লোস আলবার্তোদের নিয়ে গড়া ব্রাজিল দল ইতালির বিশ্বখ্যাত রক্ষণভাগকে ৪-১ গোলে চূর্ণ করে। ম্যাচের শেষ গোলটিতে যেভাবে আউটসাইড পাসে আলবার্তো জাল কাঁপিয়েছিলেন, তা আজও ইতিহাসের সেরা দলীয় গোল হিসেবে পাঠ্যবইয়ে জায়গা পাওয়ার যোগ্য।
রাজনৈতিক উত্তাপ ও কেম্পেসের ঝলক (১৯৭৮)
নেদারল্যান্ডসের ‘টোটাল ফুটবল’ বনাম আর্জেন্টিনার আবেগ—এই দুইয়ের লড়াইয়ে বুয়েনস আইরেসের আকাশ ঢেকে গিয়েছিল সাদা-নীল কনফেত্তি কাগজে। মারিও কেম্পেসের অতিরিক্ত সময়ের জোড়া গোলে ৩-১ ব্যবধানে জিতে ডাচদের স্তব্ধ করে দেয় আর্জেন্টিনা। এই শিরোপার হাত ধরেই লাতিন পরাশক্তি হিসেবে আর্জেন্টিনার উত্থান শুরু হয়।
জাদুকর জিদানের দুই রূপ (১৯৯৮ ও ২০০৬)
১৯৯৮ সালের প্যারিসের ফাইনালে ব্রাজিলের স্বপ্ন ভেঙে জিনেদিন জিদান দুটি দুর্দান্ত হেডে ফ্রান্সকে প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেন (৩-০), যা তাকে রাতারাতি ফরাসিদের জাতীয় নায়কে পরিণত করে। অথচ, এর ঠিক আট বছর পর ২০০৬ বার্লিন ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে পানেনকা পেনাল্টিতে গোল করার পরও মাতেরাজ্জিকে ‘হেডবাট’ করে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন তিনি। টাইব্রেকারে ইতালি চ্যাম্পিয়ন হলেও, জিদানের সেই ট্র্যাজিক বিদায় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় দৃশ্য হয়ে আছে।
মারাকানার সেই বিষাদময় দুপুর (২০১৪)
জার্মানির মেশিনারির মতো নিখুঁত ফুটবল বনাম লিওনেল মেসির একক জাদুর ফাইনাল ছিল ২০১৪ সালের মারাকানা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে একাধিক সুযোগ নষ্টের খেসারত আর্জেন্টিনাকে দিতে হয় অতিরিক্ত সময়ে। বদলি নামা মারিও গ্যোটজের ১১৩ মিনিটের দর্শনীয় ভলি গোল জার্মানিকে এনে দেয় চতুর্থ শিরোপা। আর ট্রফি ছুঁতে না পারার যন্ত্রণায় মেসির সেই শূন্য দৃষ্টির ছবি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে দাগ কেটে যায়।
লুসাইলের মহাকাব্য ও বৃত্তপূরণ (২০২২)
ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফাইনাল কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তর কাতার বিশ্বকাপের পর এক বাক্যে নির্ধারিত হয়ে গেছে—২০২২ সালের লুসাইল ফাইনাল। আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স। একদিকে ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে দাঁড়িয়ে থাকা লিওনেল মেসি, অন্যদিকে ভবিষ্যতের সম্রাট কিলিয়ান এমবাপ্পে। ১২০ মিনিটের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ে স্কোরবোর্ড ছিল ৩-৩! কিলিয়ান এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক বনাম মেসির জোড়া গোল। পেনাল্টি শুটআউটে এমিলিয়ানো মার্টিনেজের বীরত্বে ৪-২ ব্যবধানে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ৩৬ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে লিওনেল মেসির হাতে ট্রফি ওঠার মাধ্যমে যেন ফুটবল নিজেই নিজের একটি ঋণ শোধ করল। ফুটবল বিশ্ব সেদিন কেবল একটি ম্যাচ দেখেনি, দেখেছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রূপকথাকে বাস্তবে রূপ নিতে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

