বেলিংহ্যামের জোড়া গোলে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড, নরওয়ের বিদায়

এম. এম. কায়সার

বেলিংহ্যামের জোড়া গোলে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড, নরওয়ের বিদায়

বারুদের গন্ধ ছড়ানো এক লড়াইয়ের প্রত্যাশা ছিল এই ম্যাচে। আর্লিং হালান্ড বনাম জুড বেলিংহ্যাম। দুই তরুণ তারকার দ্বৈরথে জমে উঠবে কোয়ার্টার ফাইনাল—এমনই ধারণা নিয়ে যারা এই ম্যাচ দেখতে বসেছিলেন তাদের হিসেব মেলেনি। মায়ামির প্রচণ্ড গরম যেন ম্যাচের আগুনটাই নিভিয়ে দিল। শুরু থেকেই দুই দলের খেলায় ছিল ক্লান্তির ছাপ, গতি ছিল সীমিত, আক্রমণগুলোও খুব বেশি ধারালো হয়ে উঠতে পারেনি। অতিরিক্ত সময়ে সেই ক্লান্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তবু বড় ম্যাচে বড় খেলোয়াড়েরা নিজেদের আলাদা করে চিনিয়ে দেন। জুড বেলিংহ্যামও করলেন সেটাই। অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াই শেষে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইংল্যান্ড। আর দুই গোলই এসেছে বেলিংহ্যামের পা থেকে।

বিজ্ঞাপন

রাউন্ড অব সিক্সটিনে মেক্সিকোর বিপক্ষেও জোড়া গোল করে দলকে জিতিয়েছিলেন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালেও গল্পের পুনরাবৃত্তি। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন ছয়। টমাস টুখেলের দলের সাফল্যের কেন্দ্রে এখন এই রিয়াল মাদ্রিদ মিডফিল্ডার।

এই জয়ে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠল ইংল্যান্ড। এর আগে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও শেষ চারে খেলেছিল তারা। সেই আসরে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল থ্রি লায়ন্সদের। এবার তাদের সামনে ফাইনালে ওঠার নতুন সুযোগ। তবে সেমিতে তার আগে তাদের লড়তে হবে আর্জেন্টিনা অথবা সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে।

ম্যাচের শুরুটা ছিল নিয়ন্ত্রিত ও ধীরগতির। মায়ামির দমবন্ধ করা গরমের প্রভাব স্পষ্ট পড়েছিল দুই দলের খেলায়। প্রথম বিশ মিনিটে নরওয়ে রক্ষণ গুছিয়ে সব পথ বন্ধ করে রাখে। ইংল্যান্ড মাঝমাঠে ধৈর্য ধরে বল ঘোরালেও প্রাণঘাতী পাস কিংবা দ্রুতগতির আক্রমণের দেখা মিলছিল না। ডেক্লান রাইস ছিলেন মাঝমাঠের সবচেয়ে গভীরে। সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে টমাস টুখেলকে বারবার হাত ঘুরিয়ে খেলোয়াড়দের আরও দ্রুত বল চালানোর নির্দেশ দিতে দেখা যায়।

ইংল্যান্ড কয়েকবার সতর্কবার্তা পেলেও শেষ পর্যন্ত ৩৬ মিনিটে গোল হজম করে। ডান দিক দিয়ে আক্রমণে উঠে আন্দ্রেয়াস শেলডেরুপ বল পান প্রশস্ত জায়গায়। সবাই যখন আর্লিং হালান্ডের উদ্দেশে ক্রসের অপেক্ষায়, তখনই অসাধারণ এক বাঁকানো শটে বল জড়িয়ে দেন জালের ওপরের কোণায়। গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের কোনো সুযোগই ছিল না। দুর্দান্ত গোল! তবে এই গোল শোধ করে ইংল্যান্ড বিরতির আগেই। প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে বেলিংহ্যামের গোলে ম্যাচে সমতা আনে ইংল্যান্ড।

বিরতির পরও নরওয়েই ছিল বেশি গোছানো দল। বলের দখল ও গতি—দুই ক্ষেত্রেই তারা এগিয়ে ছিল। ইংল্যান্ডের রক্ষণও কয়েকবার এলোমেলো হয়ে পড়ে। নরওয়ে একাধিকবার সরাসরি আক্রমণে বিপদ তৈরি করে। এই সময় দুটি গোল বাতিল হয়, আরেকটি নিশ্চিত সুযোগও নষ্ট হয়। এই অর্ধের শেষ দিকে অবশ্য ভাগ্যেরও সহায়তা পায় ইংল্যান্ড। কর্নার থেকে গোলরক্ষক পিকফোর্ড বল পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে পারেননি। ফিরতি বলে ক্রিস্টোফার আইয়ারের শক্তিশালী হেড লেগে যায় ক্রসবারে। রিবাউন্ডে স্যান্ডার বার্গের শটও শেষ মুহূর্তে প্রতিহত করে ইংল্যান্ডের রক্ষণ। অন্য প্রান্তে বুকায়ো সাকার বাড়ানো বলও অল্পের জন্য গোলে রূপ নেয়নি। নির্ধারিত সময় শেষ হয় ১-১ সমতায়।

অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই পেনাল্টি পেয়েছিল ইংল্যান্ড। বক্সে ঢুকে পড়া জেডেন স্পেন্স প্রতিপক্ষের চাপে পড়ে গেলে রেফারি স্পটকিকের নির্দেশ দেন। কিন্তু ভিএআর পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্পেন্স নিজেই ডিফেন্ডারের পথ আটকে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন। মনিটরে রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত বদলে দেন রেফারি। স্বস্তি ফিরে আসে নরওয়ে শিবিরে।

কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি।

কিছুক্ষণ পর প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে শক্তিশালী শট নেন মরগান রজার্স। নরওয়ের গোলরক্ষক ওরইয়ান নিলান্দ বল তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন। ফিরতি বল গিয়ে পড়ে বেলিংহ্যামের সামনে। ওস্টিগার্ডকে পেছনে ফেলে ফাঁকা জালে বল ঠেলে দেন তিনি। সহজ ফিনিশ। কিন্তু ম্যাচের সবচেয়ে মূল্যবান স্পর্শ। বিশ্বকাপে এটি তার ষষ্ঠ গোল।

এই জয়ে বুধবারের সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল ইংল্যান্ড। আর স্বপ্নভঙ্গ হলো নরওয়ের। পুরো ম্যাচে আর্লিং হালান্ড ছিলেন বিস্ময়করভাবে নিষ্প্রভ। ইংল্যান্ডের রক্ষণকে তেমন কোনো সময়ই আতঙ্কে ফেলতে পারেননি বিশ্বের অন্যতম সেরা এই স্ট্রাইকার। শেষ পর্যন্ত বারুদের লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি না রাখা ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিলেন একজনই—জুড বেলিংহ্যাম।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...