ফুটবল মাঠে গোল উদযাপনের চেয়ে আনন্দের মুহূর্ত আর কিছু হতে পারে না। তবে সেই গোলটিই যখন ভুল করে নিজেদের জালে জড়িয়ে যায়, তখন আনন্দের বদলে স্টেডিয়ামজুড়ে নেমে আসে স্তব্ধতা। চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ট্র্যাজিক দৃশ্যটিই এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান গল্প হয়ে উঠেছে। গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটের শুরুতেই এবার আত্মঘাতী গোল ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব রেকর্ডকে। ডিফেন্ডারদের এই চরম হতাশার গোলগুলোই এখন ফুটবল বিশ্লেষকদের নতুন আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।
ইতিহাসের নতুন পাতাটি লেখা হলো শুক্রবার রাতে ডালাসে, যেখানে শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে মুখোমুখি হয়েছিল মিসর ও অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচের একপর্যায়ে মিসরের রাইটব্যাক মোহামেদ হানি বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে নিজেদের জালে জড়িয়ে দেন। আর এই গোলের মাধ্যমেই চলতি আসরে আত্মঘাতী গোলের সংখ্যা পৌঁছায় ১৩-তে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরে সর্বোচ্চ আত্মঘাতী গোলের নতুন রেকর্ড। কিন্তু রেকর্ডটি এখানেই থমকে থাকেনি। কয়েক ঘণ্টা পরই মিয়ামিতে আর্জেন্টিনা বনাম কেপ ভার্দের মধ্যকার ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের ১১১ মিনিটে কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার দিনেই বোর্হেসের হাত ছুঁয়ে বল নিজেদের জালে জড়ায়। এর ফলে চলতি আসরে আত্মঘাতী গোলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪-তে। এর আগে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১২টি আত্মঘাতী গোল দেখেছিল বিশ্ব। এবার টুর্নামেন্টের অর্ধেক পার হতেই সেই রেকর্ড ভেঙে চুরমার। সামনে এখনো শেষ ষোলো থেকে শুরু করে ফাইনাল পর্যন্ত হাইভোল্টেজ সব ম্যাচ বাকি। ফলে এই সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা সত্যিই ভাবনার বিষয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিশ্বসেরা ডিফেন্ডারদের উপস্থিতিতেও কেন এবার এত বেশি আত্মঘাতী গোল হচ্ছে? এর পেছনে মূলত মাঠের কৌশলগত পরিবর্তন এবং কিছু কাঠামোগত কারণ দায়ী।
সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণটি হলো বিশ্বকাপের পরিধি বৃদ্ধি। অতীতে ৩২টি দল নিয়ে ৬৪ ম্যাচের যে চেনা বিশ্বকাপ ছিল, তা এবারই প্রথম বদলে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ দলের এক বিশাল মহাযজ্ঞে। ম্যাচের সংখ্যা ৬৪ থেকে একলাফে বেড়ে হয়েছে ১০৪টি। স্বাভাবিক গাণিতিক নিয়মেই ম্যাচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্মঘাতী গোলের ঝুঁকি ও সংখ্যা দুই-ই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
দ্বিতীয় কারণটি প্রযুক্তিগত। আধুনিক ফুটবলে ভিএআর এবং চারপাশের অসংখ্য হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরার কারণে মাঠের প্রতিটি সূক্ষ্ম নড়াচড়া ধরা পড়ে। অতীতে জটলার মধ্যে কোনো ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বল গোল হলে অনেক সময় তা স্ট্রাইকারের নামে চালিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তির নিখুঁত স্ক্রিনিংয়ে ডিফেন্ডারদের আর পার পাওয়ার সুযোগ নেই, সামান্যতম ছোঁয়া লাগলেও তা আত্মঘাতী গোল হিসেবেই নথিভুক্ত হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে দলগুলোর খেলার ধরনে বা ট্যাকটিকসে। এক দশক আগেও ডেভিড বেকহ্যামদের যুগে উইঙ্গাররা সাধারণত বক্সের কোনা থেকে ভেতরের দিকে বাঁকানো ক্রস করতেন, যা ডিফেন্ডারদের জন্য ক্লিয়ার করা সহজ ছিল। কিন্তু বর্তমান ফুটবলে আক্রমণভাগ অনেক বেশি গতিশীল। ফরোয়ার্ডরা এখন একদম শেষ সীমানা বা বাইলাইন পর্যন্ত তীব্র গতিতে ছুটে গিয়ে গোলপোস্টের সমান্তরালে জোরালো ও আড়াআড়ি ‘কাট-ব্যাক’ বা লো-ক্রস করেন। এই বলগুলো যখন গোলপোস্টের একদম সামনে দিয়ে ধেয়ে যায়, তখন ডিফেন্ডাররা নিজেদের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নিজেদের জালেই ঠেলে দেন।
এছাড়া রক্ষণাত্মক কৌশল বা ‘লো ব্লক’ ফুটবলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও এর জন্য দায়ী। শক্তিতে পিছিয়ে থাকা দলগুলো যখন বড় দলের বিরুদ্ধে বক্সের ভেতর জটলা পাকিয়ে রক্ষণ সামলায়, তখন প্রতিপক্ষের যেকোনো গতিময় শট ডিফেন্ডারদের শরীরে লেগে দিক পরিবর্তন করে গোল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মাঠের তীব্র চাপের মুখে মুহূর্তের অসতর্কতা ও মানবিক ভুল। সব মিলিয়ে, পরিবর্তিত আধুনিক ফুটবল এবং ম্যাচের সংখ্যা বৃদ্ধিই মূলত এবারের বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোলের এই অনন্য অথচ ট্রাজিক রেকর্ডের জন্ম দিয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

