ফুটবল ১১ জনের পাশাপাশি দুই চিন্তকেরও যুদ্ধ। দুই দর্শনের সংঘর্ষ। দুই মানুষের বিশ্বাসের পরীক্ষা। দুদলের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা একজন কোচ বিশ্বাস করেন, ফুটবল নদীর স্রোতের মতো; তাকে বেঁধে রাখা যায় না। বাঁকের পর বাঁক পেরিয়ে নদী নিজেই পথ খুঁজে নেয়। খেলোয়াড়দেরও তাই নিজের মুহূর্ত তৈরি করার স্বাধীনতা দিতে হয়। আরেকজন বিশ্বাস করেন, নদীরও বাঁধ দরকার। নিয়ন্ত্রণহীন স্রোত শেষ পর্যন্ত সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাই প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি পাস, প্রতিটি অবস্থান; সবকিছুর একটি নির্দিষ্ট ব্যাকরণ থাকতে হবে।
আজ নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সির আলো ঝলমলে রাতে বিশ্বকাপের ট্রফির দিকে হাত বাড়াবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। কিন্তু সেই ট্রফির নিচে লুকিয়ে থাকবে আরেকটি অদৃশ্য মহারণ; লিওনেল স্কালোনি ও লুইস দে লা ফুয়েন্তের ফুটবল দর্শনের লড়াই। একজন স্বাধীনতার কবি, অন্যজন শৃঙ্খলার স্থপতি।
লিওনেল স্কালোনিকে দেখলে কখনোই মনে হয় না তিনি মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিটি চাল নিয়ন্ত্রণ করতে চান। বরং তিনি যেন একজন পরিচালক, যিনি অভিনেতাদের সংলাপ মুখস্থ করিয়ে দেন না; শুধু গল্পটা বুঝিয়ে দেন। তারপর মঞ্চ ছেড়ে দেন শিল্পীদের হাতে। এই আর্জেন্টিনা তাই একেক ম্যাচে একেক রকম। কখনো বল নিজেদের কাছে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে, কখনো বল ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ বজ্রপাতের মতো পাল্টা আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কখনো তিন ডিফেন্ডারের দেয়াল, কখনো চার ফরোয়ার্ডের ঝড়। স্কালোনির কাছে কোনো ফরমেশন ধর্ম নয়, কোনো কৌশল চিরস্থায়ী নয়। স্থায়ী যদি কিছু থাকে, তা হলো পরিস্থিতি বুঝে বদলে যাওয়ার সাহস।
সম্ভবত সে কারণেই লিওনেল মেসি তার অধীনে কখনো বন্দি হয়ে খেলেননি। স্কালোনি মেসিকে বলেননি, ‘এখানে দাঁড়াও।’ তিনি বরং পুরো দলকে এমনভাবে সাজিয়েছেন, যাতে মেসি যেখানে দাঁড়ান, সেখানেই ফুটবলের কেন্দ্র তৈরি হয়। দলের প্রয়োজনে পারদেসের পরামর্শও স্কালোনি গ্রহণ করেন সাদরে। এই বিশ্বাসই আর্জেন্টিনাকে চার বছরে এনে দিয়েছে কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ, ফিনালিসিমা। এখন তারা দাঁড়িয়ে আছে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের দোরগোড়ায়।
অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা লুইস দে লা ফুয়েন্তে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবীর মানুষ। তার স্পেনকে দেখলে মনে হয়, কোনো দক্ষ স্থপতি ইটের পর ইট বসিয়ে একটি নিখুঁত স্থাপনা নির্মাণ করছেন। সেখানে একটি ইটও যদি নিজের জায়গা ছেড়ে নড়ে যায়, পুরো কাঠামো কেঁপে উঠতে পারে। স্পেনের প্রতিটি খেলোয়াড় যেন একেকটি যন্ত্র; আলাদা করে কেউ নয়, সবাই মিলে একটি যন্ত্র। এই বিশ্বকাপে তাদের রক্ষণ সেই যন্ত্রের সবচেয়ে নিখুঁত অংশ। সাত ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম। ফ্রান্সের মতো বিধ্বংসী আক্রমণভাগও স্পেনের ডিফেন্সের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ছায়াকে খুঁজেছে। দে লা ফুয়েন্তে বিশ্বাস করেন, ফুটবলে সৌন্দর্য আসে শৃঙ্খলা থেকে। নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রতিভাও পথ হারায়।
এই দুই দর্শনের পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয় ম্যাচের সংকটময় মুহূর্তে।
স্কালোনি তখন নতুন চাল খোঁজেন। বেঞ্চের দিকে তাকান। ছক বদলান। কখনো রাইট-ব্যাককে উইঙ্গার বানিয়ে দেন, কখনো মিডফিল্ডারকে দ্বিতীয় স্ট্রাইকার। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালই তার বড় উদাহরণ। ম্যাচের শেষ ভাগে আর্জেন্টিনা বদলে ফেলেছিল নিজেদের ছন্দ। প্রতিপক্ষ বুঝে ওঠার আগেই বদলে যায় গল্প।
অন্যদিকে দে লা ফুয়েন্তে সংকট এলে আরো বেশি আঁকড়ে ধরেন নিজের দর্শন। তার বিশ্বাস, যে পথ ধরে এতদূর এসেছেন, সেই পথই শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। আতঙ্ক নয়, শৃঙ্খলাই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ফ্রান্সের বিপক্ষে এক গোলে এগিয়ে থেকেও তাই ছন্দ ধরেই পাড়ি দিয়েছেন পুরো পথ। আরো ৯০ মিনিট পাড়ি দিলেও সে পথ একই থেকে যেত বলেই ধারণা।
মজার বিষয়, দুজনের যাত্রাপথেও রয়েছে অদ্ভুত মিল। কেউই শুরুতে বিশ্বের আলোচিত কোচ ছিলেন না।
স্কালোনিকে যখন আর্জেন্টিনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, অনেকেই সেটিকে সাময়িক সমাধান ভেবেছিলেন। আর দে লা ফুয়েন্তে বছরের পর বছর স্পেনের যুব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করে ধীরে ধীরে নিজের দর্শনকে বড় মঞ্চে তুলে এনেছেন। আজ দুজনই বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় ম্যাচের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে।
ফাইনাল নিয়ে যত আলোচনা, তার বেশির ভাগই ঘুরছে লিওনেল মেসি ও লামিনে ইয়ামালকে ঘিরে। একজন হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি ছুঁতে নামবেন, অন্যজন প্রথমবার সেটি জয়ের স্বপ্ন দেখবেন। কিন্তু কখনো কখনো সবচেয়ে বড় গল্পটি মাঠের মাঝখানে নয়, টেকনিক্যাল এরিয়ায় লেখা হয়। আজ বিশ্বকাপের ট্রফি উঠবে হয় আকাশি-সাদা, নয় লাল-হলুদের হাতে। কিন্তু ট্রফির সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নেরও উত্তর মিলবে।
আধুনিক ফুটবলে শেষ পর্যন্ত জেতে কোনটি? স্বাধীনতার সাহস, নাকি শৃঙ্খলার সৌন্দর্য? ৯০ কিংবা ১২০ মিনিটের পর স্কোরবোর্ড শুধু একজন চ্যাম্পিয়নের নামই বলবে না। সেটি বলে দেবে ফুটবলের ভবিষ্যৎ কোন দর্শনের দিকে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


