বিএসএফের গুলিতে পা হারিয়ে দুর্বিষহ জীবন পঙ্গু বারীর

বিএসএফের গুলিতে পা হারিয়ে দুর্বিষহ জীবন পঙ্গু বারীর
ছবি: আমার দেশ

কুড়িগ্রামের রাজিবপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে এক পা হারিয়ে মানবেতার জীবনযাপন আব্দুল বারীর । পাননি কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ। অর্থাভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছেন না। পা হারিয়ে কোনো কাজও করতে পারছেন না । এখন তিনি পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ।

জানা গেছে, ২০০১ সালের ২৫ মে আন্তর্জাতিক মেইন পিলার ১০৭২-এর কাছে ধানক্ষেত দেখতে গিয়েছিলেন ১৭ বছরের কিশোর আব্দুল বারী। বাংলাদেশের‌ ভূখণ্ডের ১০৭২ মেইন পিলারের কাছে অবস্থান করছিলেন তিনি। কিছু টের পাওয়ার আগেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটে পড়েন। আধা ঘণ্টা পর ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাকে টেনে-হিঁচড়ে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে নিয়ে যায়। সেখানে আধা ঘণ্টা ফেলে রাখার পর তাকে ভারতের অভ্যন্তরে কালাইয়ের চর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। কালাইয়ের চর ক্যাম্প থেকে তাকে পাঠানো হয় তুরায়। সেখানে চিকিৎসার নামে তাকে দুই মাস পাঁচ দিন রেখে দিলেও দেওয়া হয়নি কোনো চিকিৎসা। তার পা পচে গন্ধ বের হচ্ছিল । তাকে কোনো প্রকার চিকিৎসা না দিয়েই শেরপুর জেলার ঢালু বর্ডার দিয়ে তাকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

সেদিনের ঘটনা বর্ণনা দিতে গিয়ে আব্দুল বারী বলেন, ‘২০০১ সালে ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ী যুদ্ধের দেড় মাস পরেই এ ঘটনা। আমি তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট। ঘুম থেকে উঠার পর বাবা বলেন, যাও ধানক্ষেত দেখে আসো। আমি বাবার কথা শুনে সীমান্তে যাই। হঠাৎ বিএসএফ সদস্যরা সীমান্তের মেইন পিলারের দিকে, আমি যেখানে অবস্থান করতে ছিলাম, আমাকে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টার দিকে যখন আমার হুঁশ হয়, তখন আমি দেখি কাঁটাতারের পাশে পড়ে আছি। পরে বিএসএফ সদস্যরা আমাকে নিকটবর্তী বিএসএফ ক্যাম্পে নিয়ে যায় । সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমি কী করতে এসেছিলাম।

আমি আমার কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তারা বলে, মিথ্যা বলিস ক্যান? তুই বল কাঁটাতার কাটতে এসেছিলাম। আমাকে বাধ্য করে যে আমি কাঁটাতার কাটতে আসছিলাম । কথাগুলো রেকর্ড করে পরবর্তীতে আমাকে তুরা জেল হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে এক মাস পাঁচ দিন থাকার পর আমাকে বাংলাদেশের অন্য বর্ডার দিয়ে পাঠিয়ে দেয়। সেখান থেকে আমার আত্মীয়স্বজন আমাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেলে ভর্তি করে। যেহেতু আমার বাম পা পচে গিয়েছিল, সে কারণে মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে আমার বাম পা কেটে ফেলে। রংপুর মেডিকেলে দেড় মাস চিকিৎসার পর আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।

ইতোমধ্যে আমার বাবা-মা মরে যায়। ভাইয়েরা আমাকে বিয়ে দিয়ে দেয়। বর্তমানে আমার তিনটি সন্তান রয়েছে। আমাকে একটি পঙ্গু ভাতা কার্ড দিলেও সেটি দিয়ে আমার সংসার চলে না। পাশাপাশি আশা এনজিও থেকে ৮০ হাজার টাকা লোন নিয়ে একটি মুদি দোকান করি। প্রতি মাসে যে বেচাকেনা হয়, তার থেকে ৮ হাজার টাকা কিস্তি দিতে হয়। ইতোমধ্যে তিন তিনবার আমার দোকানঘরটি চুরি হয়েছে। এখন কিস্তির টাকা দিব, নাকি ছেলেমেয়ে নিয়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করব—এ নিয়ে চিন্তায় আছি।’

বারী উপজেলার সদর ইউনিয়নের বালিয়ামারী ব্যাপারীপাড়া গ্রামে পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন আবদুল বারী।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন