ম্যাচের তখন ৫৩ মিনিট। ফ্রি-কিক পেল বাংলাদেশ। গোলবারের দূরত্বটা বেশ ভালো, আনুমানিক ২৫ গজ। এই দূরত্ব থেকে ফ্রি-কিকে ঝলক কেবল লিওনেল মেসিই দেখাতে পারেন। কিন্তু আরো একজন দেখালেন, তিনি বাংলাদেশের রোনান বেঞ্জামিন সুলিভান। ডান পায়ের বাঁকানো শটে রোনান বলটা ভাসিয়ে দিলেন। গোলমুখের ঠিক আগ অবধি একই গতিতে গিয়ে পরক্ষণেই বিদ্যুৎ চমকের মতো বাঁক এবং অবিশ্বাস্য গোল! এর ঠিক ১৪ মিনিট পর আরেকটি গোল করেছেন রোনান, ৬৭তম মিনিটে হেডারে করা গোলটা সাধারণ কিন্তু লাল-সবুজের জার্সিতে আলোয় রাঙা অসাধারণ এক অভিষেক উপহার দিলেন প্রবাসী এই তরুণ। আলাপ-আলোচনা, আলো-আঁধারী সবটাই রোনান কেড়ে নিলেন এক লহমায়। প্রতিভার বিচ্ছুরণে জানান দিলেন প্রবাসে বেড়ে ওঠা আর শিকড়ের প্রতি টান।
দূর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কিন্তু পরিচয়টা লাল-সবুজে দিতেই গর্ববোধ করেন রোনান। এভাবেই নিজেকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এই তরুণ ফুটবলারর। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে ওঠার ঝলকানি দেখানো এই কিশোরের গল্পটা কেবল প্রতিভার নয়, বরং একটি ফুটবলনির্ভর পরিবারে বেড়ে ওঠার গল্পও। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ—দুদেশেই আলোড়ন তুলছে সুলিভান পরিবার। ফুটবলে এক অনন্য উত্তরাধিকার গড়ে তুলছেন চার ভাই, যারা ফিলাডেলফিয়ায় জন্ম নিয়েও নিজেদের মধ্যে বহন করছে বাংলাদেশি ও জার্মান বংশধারার পরিচয়। তাদের মা হেইকে সুলিভান জার্মান-বাংলাদেশি হলেও নানি সুলতানা আলম খাঁটি বাংলাদেশি। যার সম্পর্ক ধরেই বাংলার ঐতিহ্যের শিকড় হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছেন রোনান।
ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল রোনানের নিত্যসঙ্গী। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়ন একাডেমিতে বেড়ে ওঠা। সঙ্গী ছিলেন বড় ভাই কুইন সুলিভান (২১)। কুইনকে অনেকেরই চেনার কথা। ইতোমধ্যেই মেজর লিগ সকারের দল ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের মূল দলে জায়গা করে নিয়েছেন কুইন; তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পথ বেঁকে গেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তবে রোনানের সবচেয়ে কাছেরজন জমজ ভাই ডেকলান সুলিভান ভাইয়ের পথ ধরেই হাঁটছেন। ১৮ বছর বয়সি দুই ভাইয়েরই লক্ষ্য এক-নিজেদের দক্ষিণ এশীয় শিকড়কে সম্মান জানিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা। ছোটজন ক্যাভান সুলিভান ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বয়সভিত্তিক দলে খেলছেন। চার ভাইয়ের এই ফুটবলীয় পরিবেশে বড় হওয়া যেন জীবনধারারই অংশ।
রোনানের কাছেও ফুটবল শুধুই খেলা নয়—এটি জীবনধারা। তার গল্পের সবচেয়ে বিশেষ দিকটি হলো বাংলাদেশের প্রতি টান। প্রবাসে বেড়ে উঠলেও নিজের শিকড় ভুলে যাননি রোনান। দেশের হয়ে খেলার ইচ্ছা থেকেই তিনি বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলে যোগ দেন এবং দ্রুতই নিজের জাত চেনান। আর পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে জোড়া গোলে সব ছাড়িয়ে আলোর ঝরনা বইয়ে দিয়েছেন। যে ঝরনা লাল-সবুজের ফুটবলে কালেভদ্রে দেখা যায়।
রোনান সুলিভানে মুগ্ধ দেশের কিংবদন্তি গোলকিপার ও বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। তিনি যেন লাল-সবুজেই খুঁজে পেলেন এই তরুণকে। তার ভাষ্য, ‘মাঠে সবাইকে একে অপরের ওপর সমানভাবে আস্থা রেখে খেলতে হবে—সে স্থানীয় হোক, কিংবা বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়। জন্মস্থান, বেড়ে ওঠা যেখানেই হোক না কেন, যারা দেশের জন্য লাল-সবুজের জার্সি গায়ে জড়ান, তারা সবাই বাংলাদেশি।’ জাতীয় দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া রোনানে বিমুগ্ধ হয়ে লিখেছেন, ‘অভিষেকেই পাকিস্তানের বিপক্ষে রোনানের দুটি সেরা গোল।’
আর ম্যাচ শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি পোস্ট দেন রোনান। প্রথমটিতে লেখেন, ‘কাজ শেষ। অভিষেক ম্যাচেই জোড়া গোল।’ আর দ্বিতীয় পোস্টে ১৮ বছর বয়সি এই প্রবাসী ফরোয়ার্ড লেখেন, ‘বড় মুহূর্ত, দারুণ সমাপ্তি।’ পোস্ট দুটি তার আত্মবিশ্বাস আর আনন্দেরই প্রতিফলন। রোনান সুলিভানের যাত্রা তো মাত্র শুরু। এখনো অনেকটা পথ বাকি। বেড়ে ওঠা, পরিবার থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা এবং দেশের জন্য কিছু করার তাড়না—সব মিলিয়ে যদি তিনি নিজেকে একই ধারাপাতে বয়ে নিতে পারেন, তবে ক্যারিয়ারের শেষটা বড় মুহূর্তে দারুণ সমাপ্তির মতো আলোক ঝরনায় রঙিন হতেই পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

