একটি সোনালি বল। ফুটবলারের কাছে এটি শুধু একটি পুরস্কার নয়, স্বপ্নের চূড়ান্ত স্বীকৃতি। মাঠের হাজারো গোল, অসংখ্য ট্রফি আর ব্যক্তিগত কীর্তির ভিড়ে যে সম্মান একজন খেলোয়াড়কে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে যায়, তার নাম ব্যালন ডি’অর। অথচ এই পুরস্কারের শুরুটা হয়েছিল বেশ ছোট পরিসরে। ১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের ফুটবল সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ইউরোপের সেরা ফুটবলারকে স্বীকৃতি দিতে চালু করে এই আয়োজন। প্রথমবার পুরস্কার জেতেন ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথিউস। তখন তার বয়স ৪১ বছর।
সেই ছোট্ট আয়োজন আজ পরিণত হয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বীকৃতিগুলোর একটিতে। সাত দশকের ইতিহাসে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি, রোনালদো নাজারিও, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসির মতো কিংবদন্তিদের নাম।
শুরুর দিকে ব্যালন ডি’অরের জন্য শুধু ইউরোপীয় নাগরিকত্ব থাকা ফুটবলাররাই বিবেচিত হতেন। ফলে পেলে কিংবা ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিরা ইউরোপের ক্লাবে খেললেও পুরস্কারটির যোগ্য ছিলেন না। ১৯৯৫ সালে নিয়ম বদলে ইউরোপের ক্লাবে খেলা সব দেশের ফুটবলারদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়। ওই বছর প্রথম নন-ইউরোপীয় হিসেবে পুরস্কার জেতেন লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ। ২০০৭ সালে যোগ্যতার পরিধি আরো বাড়িয়ে বিশ্বের যেকোনো লিগে খেলা ফুটবলারদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ব্যালন ডি’অর।
২০১০ সালে ফ্রান্স ফুটবলের ব্যালন ডি’অর ও ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলারের পুরস্কার একীভূত হয়ে নাম নেয় ‘ফিফা ব্যালন ডি’অর’। ছয় বছর পর আবার আলাদা হয়ে যায় দুই আয়োজন। ফিফা চালু করে ‘দ্য বেস্ট’ পুরস্কার। আর ২০২৪ সাল থেকে ব্যালন ডি’অর আয়োজনে ফ্রান্স ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উয়েফা।
কীভাবে হয় ভোটিং?
ব্যালন ডি’অরের বিজয়ী নির্ধারিত হন সাংবাদিকদের ভোটে। ২০২৬ সালের নিয়ম অনুযায়ী, পুরুষদের বিভাগে ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১০০ দেশের একজন করে সাংবাদিক ভোট দেন। নারীদের বিভাগে ভোট দেন শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিক। ফ্রান্স ফুটবলের সম্পাদকীয় দল প্রথমে ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে। এরপর ভোটাররা সেখান থেকে নিজেদের পছন্দের সেরা ১০ জনকে বেছে নেন।
প্রথম পছন্দের জন্য বরাদ্দ ১৫ পয়েন্ট, দ্বিতীয় পছন্দে ১২, তৃতীয়তে ১০। এরপর যথাক্রমে ৮, ৭, ৫, ৪, ৩, ২ ও ১ পয়েন্ট দেওয়া হয়। সব ভোটের পয়েন্ট যোগ করে নির্ধারিত হয় বিজয়ী। পয়েন্ট সমান হলে প্রথম স্থানে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া খেলোয়াড় এগিয়ে থাকেন। বিচারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ও মাঠে প্রভাব। এরপর বিবেচনায় আসে দলীয় সাফল্য এবং খেলোয়াড়সুলভ আচরণ। অর্থাৎ শুধু গোল কিংবা শিরোপা জিতলেই ব্যালন ডি’অর নিশ্চিত হয় না।
রেকর্ডের শীর্ষে মেসি
ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আটবার পুরস্কার জিতেছেন লিওনেল মেসি। ২০০৯ সালে প্রথমবার জয়ের পর ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালে টানা চারবার সেরা হন তিনি। এরপর ২০১৫, ২০১৯, ২০২১ ও ২০২৩ সালেও পুরস্কার ওঠে তার হাতে। তার পরেই পাঁচবার জিতে আছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তিনবার করে জিতেছেন ইয়োহান ক্রুইফ, মিশেল প্লাতিনি ও মার্কো ফন বাস্তেন।
নারীদের ব্যালন ডি’অর চালু হয় ২০১৮ সালে। প্রথম পুরস্কার জেতেন নরওয়ের আডা হেগারবার্গ। এরপর স্পেনের আলেক্সিয়া পুতেয়াস ও আইতানা বোনমাতি একাধিকবার এই সম্মান জিতেছেন। ২০২৬ সালে নারীদের পুরস্কার জিতেছেন পুতেয়াস।
২০২৬ সালে নতুন বিজয়ী কেইন
২০২৬ সালের পুরুষদের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন। প্রথমবারের মতো সোনালি বল হাতে তুলেছেন বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকার। দ্বিতীয় হয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, তৃতীয় লামিন ইয়ামাল। একই আয়োজনে কোপা ট্রফি, ইয়াশিন ট্রফি, গের্ড মুলার ট্রফিসহ বিভিন্ন বিভাগে দেওয়া হয় স্বীকৃতি।
বিতর্ক, ভোটের হিসাব কিংবা তারকাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা; সবকিছুর মধ্যেও ব্যালন ডি’অরের আবেদন অটুট। ১৯৫৬ সালে ইউরোপের সেরা ফুটবলার খোঁজার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখন বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক। প্রজন্ম বদলাবে, নতুন তারকা আসবেন, কিন্তু সোনালি বল হাতে তোলার স্বপ্ন ফুটবলারের কাছে থেকে যাবে চিরকাল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

