এক দশক আগে যখন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন, তখন বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাটি ছিল দুর্নীতি, আর্থিক সংকট ও আস্থাহীনতার গভীর সংকটে। সে অবস্থায় ফিফাকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েই দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। ১০ বছর পর এসে হিসাব বলছে, আর্থিকভাবে ফিফা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী। তবে একইসঙ্গে বিতর্ক, সমালোচনা ও রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও তাড়া করছে ইনফান্তিনোকে।
২০১৬ সালে সেপ ব্ল্যাটারের বিদায়ের পর ফিফার দায়িত্ব নেন ইনফান্তিনো। তখন স্পন্সর হারিয়ে সংস্থাটির আর্থিক ঘাটতি ছিল প্রায় ৫৫ কোটি ডলার। সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ফুটবলের অর্থ আবার ফুটবলের উন্নয়নেই ব্যয় হবে। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে সদস্য দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন তহবিল বাড়ানো, নতুন টুর্নামেন্ট চালু এবং বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন তিনি।
ইনফান্তিনোর আমলে ৩২ দলের বিশ্বকাপ বেড়ে ৪৮ দলে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি চালু হয়েছে নতুন ফরম্যাটের ক্লাব বিশ্বকাপ। এসব উদ্যোগের ফলে ২০২৩-২৬ অর্থচক্রে ফিফার আয় রেকর্ড ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পথে। তবে এ সাফল্যের বড় অংশই এসেছে বিতর্কিত ক্লাব বিশ্বকাপ এবং সম্প্রসারিত বিশ্বকাপ থেকে।
কাতার বিশ্বকাপের সময় থেকেই ইনফান্তিনোকে ঘিরে বিতর্ক তীব্র হতে শুরু করে। মানবাধিকার ইস্যুতে কাতারের সমালোচনার জবাবে তার বক্তব্য বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর সৌদি আরবকে ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের পথ সহজ করে দেওয়া, নতুন টুর্নামেন্টের সূচি নিয়ে খেলোয়াড়দের সংগঠনের আপত্তি উপেক্ষা করা এবং নিজের বেতন বৃদ্ধি নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি।
গত কয়েক বছরে ইউরোপীয় ফুটবলের সঙ্গে ইনফান্তিনোর সম্পর্কও ক্রমেই অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানায় উয়েফা। ২০২৫ সালে ফিফা কংগ্রেসে দেরিতে উপস্থিত হওয়ায় উয়েফার প্রতিনিধিরা ওয়াকআউটও করেন।
এ বছরের বিশ্বকাপেও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি ফিফাকে। যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা জটিলতা, কিছু কর্মকর্তা ও সমর্থকের প্রবেশে বাধা, শাস্তি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং বিশ্বকাপের চড়া টিকিটমূল্য ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। এর মধ্যেই ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার পরিকল্পনা সামনে এলে তীব্র বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সংস্থাটি। এরপরই উয়েফা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর তাদের আস্থা নেই।
তবে সমালোচনার মাঝেও ইনফান্তিনোর কৃতিত্ব অস্বীকার করা কঠিন। তার সময়ে ছোট ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা অনেক ফুটবল ফেডারেশন অবকাঠামো এবং উন্নয়ন তহবিলে উল্লেখযোগ্য সহায়তা পেয়েছে। ফিফার আর্থিক স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং সংস্থার আয়ও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
২০১৯ ও ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হওয়া ইনফান্তিনোর সামনে এখন ২০২৭ সালের নির্বাচন। ফিফার গঠনতন্ত্রে তিন মেয়াদের সীমা থাকলেও বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী তিনি আবারও প্রার্থী হতে পারবেন। ফলে আগামী বছরগুলোতে বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই প্রশাসকের উত্তরাধিকার শেষ পর্যন্ত কীভাবে মূল্যায়িত হবেনÑসেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

