সবকিছু ভুলে যাও… ম্যাচের আগে কেন একথা বলেছিলেন মেসি?

চোখের জল, নীরবতা আর রহস্যময় ফাইনালে অচেনা আর্জেন্টিনা

চোখের জল, নীরবতা আর রহস্যময় ফাইনালে অচেনা আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হয়েছে। ট্রফি উঠেছে স্পেনের হাতে। কিন্তু নিউ জার্সির সেই রাত শেষ হওয়ার পরও একটি প্রশ্ন এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের মনেÑফাইনালের আগে আর্জেন্টিনা শিবিরে কি এমন কিছু ঘটেছিল, যার ছাপ দেখা গিয়েছিল পুরো ম্যাচজুড়ে?

এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর এখনো কারো কাছে নেই। ফিফা কিছু বলেনি, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও নয়। লিওনেল স্কালোনিও বিতর্ক এড়িয়ে গেছেন। তবুও কিছু ভিডিও, কিছু দৃশ্য, কিছু পরিসংখ্যান এবং কিছু অস্বাভাবিক ঘটনার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত নানা আলোচনা থামছেই না।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার শুরু ড্রেসিংরুমের একটি ভিডিও দিয়ে।

প্রথমে ভাইরাল হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি ক্লিপ। সেখানে লিওনেল মেসিকে বলতে শোনা যায়, ‘শান্ত থাকো... শুধু খেলায় মনোযোগ দাও... সবকিছু ভুলে যাও।’

মাত্র এ কয়েকটি শব্দই জন্ম দেয় অসংখ্য ব্যাখ্যার। ‘সবকিছু’ বলতে কি বোঝাতে চেয়েছিলেন মেসি? কেন এমন কথা বলেছিলেন? ম্যাচের আগে ঠিক কী ভুলে যেতে বলছিলেন সতীর্থদের?

এরপর প্রকাশ্যে আসে আরো দীর্ঘ একটি ভিডিও। সেখানে ছবিটা কিছুটা ভিন্ন।

ভিডিওতে দেখা যায়, এমিলিয়ানো মার্টিনেজ ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে স্পেনের আক্রমণভাগ নিয়ে নির্দেশনা দিচ্ছেন। লামিনে ইয়ামালকে কীভাবে আটকে রাখতে হবে, উইং থেকে আক্রমণ এলে কীভাবে অবস্থান নিতে হবে-এসব নিয়েই আলোচনা চলছে। লিসান্দ্রো মার্টিনেজও রক্ষণ নিয়ে নিজের মতামত দিচ্ছেন। নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে আলাদা করে উৎসাহ দিচ্ছেন তিনি। মেসিও সতীর্থদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও এনজো ফার্নান্দেজ যেন অযথা বেশি ওপরে উঠে না যান। সবশেষে রোমেরো যখন দিবুকে বলেন, ‘আজ তোমার দিন’, তখন গোলরক্ষকের জবাব ছিল, ‘আজ আমার দিন, আজ ইতিহাস লেখা হবে।’

নতুন ভিডিও প্রকাশের পর প্রথম ক্লিপটির ব্যাখ্যা অনেকটাই বদলে যায়। অনেকের মতে, মেসির ‘সবকিছু ভুলে যাও’ কথাটি হয়তো বাইরের কোনো ঘটনা নয়, বরং ফাইনালের চাপ ভুলে শুধু ম্যাচে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান ছিল।

কিন্তু ভিডিওর বিতর্ক থামলেও প্রশ্নগুলো থামেনি।

স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর সময় দলীয় বাস থেকে নেমে স্কালোনিকে আবেগপ্রবণ দেখা যায়। ওয়ার্ম আপে মেসির একের পর এক শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, যা তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে খুবই বিরল দৃশ্য। ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষাও ছিল অস্বাভাবিক গম্ভীর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এনজো ফার্নান্দেজ ও লিসান্দ্রোকে আবেগপ্রবণ অবস্থায়ও দেখা যায়। এসব ঘটনার কোনোটিই আলাদাভাবে হয়তো বড় খবর নয়। কিন্তু সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে অনেকেই ভিন্ন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন।

এরপর শুরু হয় ম্যাচ।

পুরো টুর্নামেন্টে যে কৌশলে সফল ছিল আর্জেন্টিনা, ফাইনালে যেন সেই পরিচিত ছন্দের দেখা মিলল না। এর ফলে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ দ্রুত স্পেনের হাতে চলে যায়। লিওনেল মেসি ও হুলিয়ান আলভারেজ দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বিস্ময়করভাবে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। অথচ বেঞ্চে বসেই পুরো ম্যাচ কাটান দলের অন্যতম কার্যকর স্ট্রাইকার লাউতারো মার্টিনেজ!

রক্ষণেও দেখা যায় অস্বাভাবিক কিছু দৃশ্য। রোমেরো ও লিসান্দ্রোর মতো দলের সবচেয়ে লড়াকু দুই ডিফেন্ডার চোটের কারণে মাঠ ছাড়েন। তবে টেলিভিশন ক্যামেরায় তাদের তীব্র ব্যথায় কাতরাতে দেখা যায়নি। আবার ম্যাচ শেষে ট্রফি বিতরণী অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে করমর্দন এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।

অন্যদিকে রেফারিং নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। স্পেনের একাধিক ফাউলের পরও কার্ড না দেখানো, মেসির ওপর ট্যাকল কিংবা কুকুরেয়াকে ঘিরে বিতর্ক-এসব নিয়ে সমর্থকদের ক্ষোভ ছিল স্পষ্ট। তবে ম্যাচ পরিচালনায় কোনো অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এসব কিছুর মাঝেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জন্ম নেয় একের পর এক ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব। কেউ মালভিনাস (ফকল্যান্ড) ইস্যুর প্রসঙ্গ টানেন, কেউ রাজনৈতিক চাপের কথা বলেন, আবার কেউ খেলোয়াড়দের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও জল্পনা ছড়ান।

কিন্তু এখানেই থামা উচিত কি না-সেটা আপেক্ষিক প্রশ্ন। কারণ, এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি। ফিফা, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষ এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি, যা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় মাঠের বাইরের কোনো ঘটনা ফাইনালের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল।

তবুও প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে। কেন এত অচেনা লাগছিল আর্জেন্টিনাকে? কেন দেখা যায়নি তাদের চিরচেনা আগ্রাসন? কেন ম্যাচের আগের পরিবেশ এত ভারী মনে হচ্ছিল? আর কেনইবা মেসি বলেছিলেন, ‘সবকিছু ভুলে যাও’?

হয়তো এসবের উত্তর খুবই সাধারণ। আবার হয়তো এমন কোনো গল্প লুকিয়ে আছে, যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। এই প্রতিবেদনেও সময়ের সঙ্গে আপেক্ষিক বিষয়টিই প্রধান্য পেয়েছে। বিশ্বকাপ ফাইনাল ঘিরে আলোচিত ঘটনাগুলো একসঙ্গে তুলে ধরাটাই উদ্দেশ্য। সত্যটা কী, গুঞ্জন কী আর কল্পনা কতটা-সে বিচার পাঠক আর সময়ের হাতে

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন