সরকারের সমালোচনায় কারাবন্দি সোমালি নারী মুক্ত

সরকারের সমালোচনায় কারাবন্দি সোমালি নারী মুক্ত

সোমালিয়ার সরকারের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলার কারণে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও কারাভোগের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন দেশটির ২৭ বছর বয়সি নারী সাজিয়া মোলিম আলী। তিনি দাবি করেছেন, পুলিশ হেফাজত ও কারাগারে তাকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। পরে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অবমাননার অভিযোগে তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে আপিলের পর আদালত সেই সাজা বাতিল করলে ১২ আগস্ট তিনি মুক্তি পান।

টিকটক ও ফেসবুকে মোগাদিশুর জোরপূর্বক উচ্ছেদ, জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরকারি স্বজনপ্রীতি ও বেকারত্বসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথা বলতেন সাজিয়া। হাসপাতাল ও সরকারি দপ্তরে চাকরির আবেদন করতে গিয়ে তিনবার যৌন সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে চাকরি পাওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

গ্রেপ্তারের দুই দিন আগে দুই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে জোর করে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। থানায় তাকে চড় মারা হয় এবং দেয়ালে মাথা ঠুকে দেওয়া হয়। সে সময় তিনি কোনো আইনজীবীর সহায়তা পাননি এবং তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও জানানো হয়নি। পরে তাকে মোগাদিশু কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

কারাগারের নারী শাখায় প্রায় ১২০ জন বন্দি ছিলেন এবং প্রায় ৩০ জনকে একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল। কারাগারটি ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত এবং দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা হয়নি। কক্ষে জানালা বা পর্যাপ্ত আলো ছিল না এবং একমাত্র টয়লেটে কোনো দরজাও ছিল না।

কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি আরো অনেক নারীর সঙ্গে পরিচিত হন। তাদের মধ্যে ১৩ ও ১৭ বছর বয়সি দুই কিশোরীও ছিল। অনেক নারী ঋণ বা জরিমানা পরিশোধ করতে না পারায় কারাগারে ছিলেন। কেউ কেউ আইনজীবীর সহায়তা ছাড়াই বছরের পর বছর কারাদণ্ড পেয়েছিলেন এবং কী অপরাধে তাদের সাজা দেওয়া হয়েছে, সেটিও বুঝতে পারেননি। তিনি কারাগারের কয়েকজন নারীকে পড়তে ও লিখতে শেখানো শুরু করেন।

কারাগারে থাকা অবস্থায় একটি স্থানীয় রেডিওতে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর সাজিয়াকে নির্যাতনের জন্য একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে পোশাক খুলতে বাধ্য করা, মারধর এবং পানি ঢেলে দেওয়ার মতো নির্যাতন করা হয়। এরপর তাকে যৌন নির্যাতনের হুমকি দেওয়া হয় এবং কয়েকজন পুরুষ তাকে যৌন নির্যাতন করে তার ভিডিও ধারণ করে।

কারাগারে প্রায় এক মাস থাকার পর সাজিয়া একজন আইনজীবীর সহায়তা পান। আদালতে তার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অবমাননা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রসিকিউশন দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত তার নির্যাতনের ঘটনাসংক্রান্ত প্রতিবেদনও আদালতে উপস্থাপন করে এবং তাকে সরকারবিরোধী প্রচারণা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করে।

২৫ জুন আদালত তাকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অবমাননার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন। এর আগে তার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে উসকানির অভিযোগও আনা হয়েছিল, তবে ওই অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি। সাজিয়ার সাজা ঘোষণার পর সোমালিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট শরিফ শেখ আহমেদসহ দেশটির কয়েকজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও মানবাধিকার সংগঠন এর নিন্দা জানিয়েছিল।

পরে সাজিয়ার আইনজীবী রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ১২ আগস্ট বানাদির আঞ্চলিক আপিল আদালত তার দণ্ড ও সাজা বাতিল করে তাকে মুক্তির নির্দেশ দেয়। মুক্তির পর মেয়ের সঙ্গে দেখা করার মুহূর্তটিকেও অত্যন্ত কষ্টকর বলে বর্ণনা করেছেন সাজিয়া। তিনি জানান, দীর্ঘ কারাবাসের পর তার মেয়ে তাকে প্রথমে চিনতে পারেনি।

মুক্তির পরও হুমকি অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছেন সাজিয়া। তার দাবি, আল-শাবাবের সদস্যরাও তার মামলাটি নিয়ে তৈরি হওয়া প্রচারের বিষয়টি জানতে পেরে তাকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করে। নিরাপত্তার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত তিনি সোমালিয়া ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বর্তমানে তিনি কারাগারে পাওয়া অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন এবং মানসিক সহায়তা নিচ্ছেন বলে জানান। একই সঙ্গে কারাগারে দেখা নারীদের অধিকার ও মুক্তির জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার পাশাপাশি একটি বই লেখার কাজও করছেন সাজিয়া।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...