ইবোলা মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে কেনিয়া। ৬ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রায় ৫ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ এবং পাঁচটি পরীক্ষাগার নির্ধারণ করেছে দেশটি। কিন্তু রাজধানী নাইরোবির বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ওয়াজির কাউন্টিতে ইবোলা সন্দেহে এক ব্যক্তির অসুস্থ হওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। ওই ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষায় ইবোলা শনাক্ত হয়নি। তবে স্থানীয় পর্যায়ে আইসোলেশন কেন্দ্রের সক্ষমতা, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা ও সুরক্ষাসামগ্রীর পর্যাপ্ততা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
কেনিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় শুধু বিমানবন্দর ও আনুষ্ঠানিক সীমান্তপথে যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত করা, নিরাপদে তাকে আলাদা রাখা, নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী, পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রী, কার্যকর আইসোলেশন কেন্দ্র এবং রোগীকে উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর সুস্পষ্ট ব্যবস্থা।
ওয়াজির কাউন্টির যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক গারাদ সানে মোহামেদ আল-জাজিরাকে বলেন, ইবোলা মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করতে কাউন্টির প্রধান শহর ওয়াজিরে একটি আইসোলেশন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে দ্রুত সাড়াদানকারী দলও। এ ছাড়া বেতারে প্রচার, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের কার্যক্রম, বিদ্যালয়ভিত্তিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি ও পোস্টারের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। প্রস্তুতি পরিকল্পনাসহ বাজেটও করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে আইসোলেশন কেন্দ্রটিতে একসঙ্গে কতজন রোগীকে রাখা যাবে, ইবোলা মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণ পাওয়া স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কত এবং এ খাতে কত বাজেট বরাদ্দ রয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি কাউন্টি কর্তৃপক্ষ। ফলে সন্দেহভাজন রোগীকে নিরাপদে সামাল দেওয়া কিংবা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো জনবল ও সরঞ্জাম সেখানে রয়েছে কি না, তা মূল্যায়ন করা কঠিন।
ওয়াজিরের ওই সন্দেহভাজন রোগী ২০ বছর বয়সি এক ব্যক্তি। তিনি কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র থেকে উগান্ডা হয়ে ২০ সেপ্টেম্বর নিজের বাড়ি ওয়াজিরে পৌঁছান। গুরুতর জ্বর নিয়ে তিনি ওয়াজির সাউথ এলাকার হাবাসওয়েইন সাব-কাউন্টি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। কাউন্টি কর্তৃপক্ষ জানায়, তার নমুনা পরীক্ষায় ইবোলা শনাক্ত হয়নি। চিকিৎসা চলাকালে তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখার কথা ছিল।
তবে এই ঘটনায় সংক্রমণ শনাক্ত না হওয়া থেকে ওয়াজিরের সামগ্রিক প্রস্তুতি যথেষ্ট বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সুরক্ষাসামগ্রীর পর্যাপ্ততা, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষিত কর্মী, নমুনা পরিবহনের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে পরীক্ষাগারের যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ওয়াজির থেকে সোমালিয়ার দূরত্ব প্রায় ১১০ কিলোমিটার। সীমান্ত দিয়ে মানুষ ও পণ্যের চলাচল থাকায় সেখানে নজরদারি ও জনসচেতনতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আনুষ্ঠানিক প্রবেশপথে স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি হলেও তা স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকার বিকল্প নয়। রোগের লক্ষণ শনাক্ত করে মানুষকে সঠিক চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর সক্ষমতাও থাকতে হবে।
কেনিয়ার জাতীয় পর্যায়ে ইবোলা মোকাবিলার তৎপরতা বাড়ে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র থেকে উগান্ডা হয়ে আসা এক ব্যক্তির সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ওই রোগী ৩ অক্টোবর নাইরোবিতে পৌঁছান। তাঁর শরীরে ইবোলার বান্দিবুগিও ধরন শনাক্ত হয়। ৫ অক্টোবর তিনি মারা যান। ৬ অক্টোবর কেনিয়া ডব্লিউএইচওকে বিষয়টি জানায়।
ওই ব্যক্তি কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে থাকাকালে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে সড়কপথে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় যান এবং সেখান থেকে বিমানে নাইরোবিতে পৌঁছান। কেনিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ন্যাশনাল ভাইরোলজি রেফারেন্স ল্যাবরেটরি ও কেনিয়া মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায় তাঁর সংক্রমণ নিশ্চিত হয়।
এরপর ১৪ অক্টোবর কেনিয়ায় ইবোলার বান্দিবুগিও ধরনে আক্রান্ত দ্বিতীয় রোগী শনাক্ত হয়। ৩৯ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি প্রথম রোগীর ঘনিষ্ঠ পরিবারের সদস্য। তিনি আগে থেকেই কোয়ারেন্টিনে ছিলেন এবং প্রতিদিন তার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। ১৩ অক্টোবর তার জ্বর, ক্লান্তি ও গিঁটে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরীক্ষায় সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে নির্ধারিত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুই রোগীর মধ্যে সংযোগ রয়েছে। তবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপর প্রবেশপথগুলোতে নজরদারি, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়। ওয়াজিরের সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা পরীক্ষায় ইবোলা শনাক্ত না হওয়ায় দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষার গুরুত্বও সামনে এসেছে।
কেনিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটিতে ৬ লাখ ৫২ হাজার ৫৮৪ জন যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছিল। ২৬৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয় এবং ইবোলা প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৯৭১ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
১২ অক্টোবর ডব্লিউএইচও জানায়, তত দিনে ৬ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে। সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা ১২৭ জনকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৯৪ জনকে কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। ইবোলা পরীক্ষার জন্য পাঁচটি পরীক্ষাগার নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
এই পরিসংখ্যান জাতীয় পর্যায়ের তৎপরতার ব্যাপকতা তুলে ধরে। তবে কতজন যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে বা কতজন স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, শুধু তা দিয়ে দেশের প্রতিটি এলাকায় প্রস্তুতির মান বোঝা যায় না। প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম কোথায় কতটা রয়েছে এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সন্দেহভাজন রোগীকে কত দ্রুত সামাল দিতে পারে, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
ডব্লিউএইচওর হিসাবে, ইবোলা মোকাবিলায় কেনিয়ার জাতীয় প্রস্তুতির স্কোর মে মাসের ৬৬ শতাংশ থেকে জুলাইয়ে বেড়ে ৮২ শতাংশে পৌঁছায়। এই মূল্যায়নে নজরদারি, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, রোগীকে আলাদা রাখা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত সাড়াদানকারী দলের মতো বিষয় বিবেচনা করা হয়।
প্রস্তুতির স্কোর বাড়া অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। তবে জাতীয় পর্যায়ের এই স্কোর দিয়ে প্রতিটি কাউন্টিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত কর্মী ও রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায় না। স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা যাচাই না করলে জাতীয় পরিসংখ্যানে ধরা না পড়া ঘাটতি অজানা থেকে যেতে পারে।
কেনিয়া রেড ক্রসও প্রস্তুতি ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে সহায়তা করেছে। সংস্থাটির প্রতিনিধি চিকিৎসক পল ওলালে প্রস্তুতি মূল্যায়ন নিয়ে আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলেন। তবে এ প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া তথ্যে সংস্থাটির নামে উল্লেখ করা পৃথক একটি পরিসংখ্যানের ভিত্তি স্পষ্ট নয়। ফলে ওই সংখ্যা দিয়ে কী পরিমাপ করা হয়েছিল কিংবা কাউন্টি পর্যায়ে কোনো দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইবোলা নিয়ে ভুল তথ্য ও গুজব মোকাবিলাও প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রাদুর্ভাবের সময় গুজব ছড়ালে রোগের লক্ষণ, ভাইরাস কীভাবে ছড়ায় এবং কখন চিকিৎসা নিতে হবে—এসব বিষয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই বাসিন্দাদের জানতে হবে, কোথায় চিকিৎসা নিতে হবে, সন্দেহভাজন অসুস্থতার খবর কীভাবে জানাতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শের অপেক্ষায় কী করতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহ জানালে সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা কমানো জরুরি।
কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় বেতারকেন্দ্র, বিদ্যালয় ও আস্থাভাজন সামাজিক নেতারা মানুষের বোধগম্য ভাষায় এসব তথ্য পৌঁছে দিতে পারেন। তবে সচেতনতামূলক প্রচার তখনই কার্যকর হবে, যখন স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত সাড়া দিতে পারবে।
১২ অক্টোবর প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর এক বিবৃতিতে কেনিয়ার জনস্বাস্থ্য ও পেশাগত মানবিষয়ক প্রধান সচিব মেরি মুথোনি সামনের সারির স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। স্বাস্থ্যবিষয়ক মন্ত্রিসভার সচিব আদান দুয়ালের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এই দেশে কোনো স্বাস্থ্যকর্মীকে যথাযথ সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়া সন্দেহভাজন ইবোলা রোগীর চিকিৎসা করতে বলা উচিত নয়।’
কেনিয়া জাতীয় পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া, স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাড়ানো এবং পরীক্ষাগারের মাধ্যমে সংক্রমণ শনাক্ত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। কিন্তু রাজধানীর বাইরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর, তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি যাচাই জরুরি। আইসোলেশন কেন্দ্র, দ্রুত সাড়াদানকারী দল ও সচেতনতামূলক প্রচার থাকার পাশাপাশি পর্যাপ্ত সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত কর্মী, দ্রুত নমুনা পরীক্ষা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন, সেসব জায়গায় প্রস্তুতির ঘাটতি চিহ্নিত করে তা দূর করাই হবে ইবোলা মোকাবিলায় কেনিয়ার বড় চ্যালেঞ্জ।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

