মাত্র ৩৮ বছর বয়সী সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে আফ্রিকার অন্যতম আলোচিত নেতা হয়ে উঠেছেন। ২০২২ সালের এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর সমর্থকদের কাছে তিনি জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
তবে দেশের বাইরে তার জনপ্রিয়তা বাড়লেও নিজ দেশ বুরকিনা ফাসোয় তার শাসন নিয়ে প্রশ্নও বাড়ছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিধিনিষেধ, অব্যাহত নিরাপত্তা সংকট এবং জাতীয় পুনর্জাগরণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনতে পারবে—এসব বিষয় এখন তার নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এপ্রিল মাসে ত্রাওরে বুরকিনা ফাসোর জনগণকে ‘গণতন্ত্র ভুলে যেতে’ বলেছিলেন। তার যুক্তি ছিল, দেশ এখন গণতান্ত্রিক পর্যায়ে নয়, বরং একটি বিপ্লবী সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই মন্তব্যের পর তার সরকার সামরিক নেতৃত্বাধীন রূপান্তরকাল আরো বাড়ায় এবং রাজনৈতিক দলগুলো বিলুপ্ত করে। এতে স্পষ্ট হয়, দ্রুত বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর তার সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার নয়।
ত্রাওরের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং দেশের অভ্যন্তরের বাস্তব পরিস্থিতির এই পার্থক্যই এখন তার নেতৃত্বের অন্যতম বড় প্রশ্ন।
কেন জনপ্রিয় ত্রাওরে?
বুরকিনা ফাসোর বাইরেও ত্রাওরের জনপ্রিয়তা রয়েছে। আফ্রিকার অনেক দেশে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক অভিজাতদের বিরুদ্ধে যে অসন্তোষ রয়েছে, ত্রাওরে সেই অনুভূতিকে কাজে লাগিয়েছেন।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর তিনি বুরকিনা ফাসো থেকে ফরাসি সেনা প্রত্যাহার করেন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং স্থানীয় শিল্প ও কৃষিকে গুরুত্ব দেন।
তার সরকার অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছে। সাহেল অঞ্চলের অন্যান্য সামরিক সরকারগুলোর মতো বুরকিনা ফাসোও পশ্চিমা নিরাপত্তা অংশীদারদের থেকে দূরে সরে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলছে।
ত্রাওরের বক্তব্যে প্রায়ই উঠে আসে দেশটির সাবেক বিপ্লবী নেতা থমাস সাঙ্কারার উত্তরাধিকার। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বুরকিনা ফাসোর শাসক থাকা সাঙ্কারা আফ্রিকায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
সমর্থকদের দাবি, ত্রাওরে দেশের জাতীয় গর্ব ফিরিয়ে এনেছেন এবং বাইরের শক্তির ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বেকন কনসালটিং লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা কবির আদামু আল–জাজিরাকে বলেন, ‘বুরকিনা ফাসোয় যা ঘটছে, তা হলো জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে কার্যকারিতার সম্পর্কের পরিবর্তন।’
তার মতে, ত্রাওরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কার্যকারিতার চেয়ে সার্বভৌমত্বের ধারণার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে পুনর্গঠন করেছেন।
কী পরিবর্তন এনেছেন ত্রাওরে?
ত্রাওরে তার সার্বভৌমত্বের বার্তাকে নীতিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তার সরকার স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশি অংশীদারদের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
সরকারের দাবি, কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে চাল ও ভুট্টার মতো খাদ্যশস্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প বিকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অবকাঠামো প্রকল্প এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে দেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সরকার সমর্থকদের মতে, এসব উদ্যোগ অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি করছে এবং দেশের সম্পদ দেশের উন্নয়নে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সরকার ‘ভলান্টিয়ার্স ফর দ্য ডিফেন্স অব দ্য হোমল্যান্ড’ কর্মসূচিও সম্প্রসারণ করেছে। এটি একটি বেসামরিক বাহিনী, যা নিরাপত্তা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি
এটাই ত্রাওরের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
ক্ষমতায় আসার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করবেন। কিন্তু বুরকিনা ফাসো এখনো সাহেল অঞ্চলের অন্যতম সহিংসতাপ্রবণ দেশ।
আল-কায়েদা ও আইএসের সঙ্গে যুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বছরের পর বছর ধরে দেশটির বড় অংশে প্রভাব বিস্তার করেছে।
২০২২ সালের পর সেনাবাহিনী দেশজুড়ে অভিযান জোরদার করেছে এবং সরকার বিভিন্ন শহর ও কৌশলগত এলাকা পুনর্দখলের দাবি করেছে।
তবে ঘানার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মুস্তাফা বাতুরে সাল্লামা আল–জাজিরাকে বলেন, ত্রাওরের প্রেসিডেন্সি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা উন্নত হয়েছে, তার ওপর।
তিনি বলেন, বুরকিনা ফাসো এখনো আল-কায়েদার সাহেল শাখা জামা’আত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (জেএনআইএম) এবং আইএসের পশ্চিম আফ্রিকা শাখার হুমকির মুখে রয়েছে।
সাল্লামার মতে, দেশটিতে লাখো মানুষ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে। ২০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি নিরাপত্তা দাবির স্বাধীন যাচাইও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাংবাদিক, গবেষক ও মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ায় পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র জানা আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
ত্রাওরের সরকার ধীরে ধীরে সামরিক রূপান্তরকাল থেকে ক্ষমতা আরো কেন্দ্রীভূত করার পথে এগোচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
জানুয়ারিতে দেশটির কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো বিলুপ্ত করে এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে। সরকারের যুক্তি ছিল, জাতীয় সংকটের সময়ে এসব কর্মকাণ্ড বিভাজন তৈরি করছে।
এর আগে সামরিক রূপান্তরকাল বাড়ানো হয়, যা বেসামরিক শাসনে ফেরার প্রক্রিয়াকে আরো পিছিয়ে দেয়।
ফলে ত্রাওরের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জনগণের প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রাখা।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

