দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর, চলতি বছরের চার মার্চ কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে দেওয়া প্রথম ভাষণে, ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চমকপ্রদ বিষয়ে প্রকাশ করেছেন।
তিনি ২০২১ সালের আগস্টে কাবুল বিমানবন্দরে ভয়াবহ বোমা হামলার কথা উল্লেখ করেন। ভাষণে তিনি জানান, হামলায় অভিযুক্ত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই গ্রেফতারের জন্য তিনি যে দেশকে কৃতিত্ব দেন তাহলো পাকিস্তান। ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘এই দানবকে গ্রেপ্তারে সহায়তা করায় আমি বিশেষ করে পাকিস্তান সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’
তিন মাসেরও বেশি সময় পর, ট্রাম্প গত বুধবার হোয়াইট হাউজে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সায়্যিদ আসিম মুনিরকে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান। প্রথমবারের মতো কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের একজন সামরিক প্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যিনি দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান নন।
যে দেশটির বিরুদ্ধে মাত্র সাত বছর আগে ট্রাম্প অভিযোগ করেছিলেন যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘মিথ্যা ও প্রতারণা’ ছাড়া কিছুই দেয়নি এবং সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং যে দেশটিকে তার পূর্বসূরী জো বাইডেন ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর মধ্যে একটি’ বলে অভিহিত করেছিলেন, এরপর এই বৈঠক অবশ্যই একটি নাটকীয় পরিবর্তনের লক্ষণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে কয়েক সপ্তাহ ধরেই সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে এবং মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষের মাধ্যমে এটি আরও দৃঢ় হয়েছে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করে।
তবে কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক নীতির পরিবর্তে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অবস্থানের ফল হিসেবে দেখা উচিৎ।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের (এমইআই) সিনিয়র ফেলো মারভিন ওয়েইনবাউম আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এমন একটি প্রশাসনকে নিয়ে কথা বলছি, যারা ঘন্টায় ঘন্টায় তার সুর পাল্টায়। এখানে কোনও প্রক্রিয়া নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনি এমন একটি প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছেন যা কৌতূহলী এবং ব্যক্তিকেন্দ্রীক। আপনি এটিকে ঐতিহ্যবাহী মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে যুক্ত করবেন না।’
তবে, অন্যরা উল্লেখ করেছেন ট্রাম্পের পাকিস্তানি সেনাপ্রধানকে স্বাগত জানানোর দৃষ্টিভঙ্গিও তাৎপর্যপূর্ণ।
সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কের বিশিষ্ট প্রভাষক রাজা আহমেদ রুমি বলেন, ‘পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে ট্রাম্পের মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ কেবল প্রোটোকল ভঙ্গ নয়, এটি প্রোটোকলকে পুনঃনির্ধারণ করেছে।’
তিনি আরো বলেন ‘এটি স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে পাকিস্তান কেবল ওয়াশিংটনের রাডারেই নয়, এটি অভ্যন্তরীণ বৃত্তের মধ্যে রয়েছে, অন্তত এখনকার জন্য।’
আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন
ট্রাম্প এবং মুনিরের মধ্যে এই বৈঠকটি এমন সময় হলো যখন মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র উত্তেজনা চলছে। ১৩ জন থেকে ইরানে হামলা চালাচ্ছে ইসরাইল। পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানও।
যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে ইসরাইল।
তবে ট্রাম্পের মতে, মুনিরের সাথে সাক্ষাতের মূল কারণ ছিল মে মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সংঘাত নিরসনে ভূমিকার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানানো। যে সংঘাত এই অঞ্চলকে পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকেও ধন্যবাদ জানান তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্ততায় সেসময় দু’দেশের মধ্যকার সংঘাত বন্ধ হয়।
পুনরায় প্রাসঙ্গিকতা জাহির করার সুযোগ
পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় থেকে। তবে ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানে পাওয়া যাওয়ার পর থেকে মার্নিন নীতি নির্ধারকরা পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন।
কিন্তু ওয়েইনবাউম বলেন যে, ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তান এমন সম্মান পাচ্ছে যা পূর্ববর্তী বাইডেন প্রশাসনের সময় দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ট্রাম্প সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সহায়তা চেয়েছিলেন যা তিনি পেয়েছেন।
প্রভাষক রাজা আহমেদ রুমি ট্রাম্প-মুনির বৈঠককে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অস্থিরতা কমাতে পাকিস্তানের সাহায্য চায়। পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের জন্য, এটি তাদের প্রাসঙ্গিকতা পুনরায় জাহির করার একটা সুযোগ।’
বিনিময়ের সম্পর্ক এবং গণতান্ত্রিক ব্যয়
ঐতিহাসিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক মূলত বিনিময়ের। বিশেষ করে নিরাপত্তা ক্ষেত্রে।
তবে সম্পর্কটি অবিশ্বাসের দ্বারাও চিহ্নিত হয়েছে। মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান দাবি করেছে যে তারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছে তা সম্মান করতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক শিক্ষাবিদ রুমি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহ্যগতভাবে যখন প্রয়োজন তখনই পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং যখন সম্ভব হয়েছে তখনই পিছু হটেছে।
পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনকে অস্থায়ী বলে বর্ণনা করে ওয়েনবাউম বলছেন, ‘বর্তমান মার্কিন প্রশাসনে কিছুই স্থায়ী নয়।’
পর্দার আড়ালের শক্তি
সেনাবাহিনী পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। রাজনীতি ও সমাজের উপর তাদের বিশাল প্রভাব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুনির হলেন দ্বিতীয় পাকিস্তানি যিনি ফিল্ড মার্শাল পদমর্যাদা অর্জন করেছেন। তিনি এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করেন যে বেসামরিক সরকার থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতেই রয়ে গেছে।
শিক্ষাবিদ রুমি বলেছেন যে বেসামরিক ব্যবস্থাকে এড়িয়ে সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক, গণতন্ত্রকে যারা সুসংহত করতে চায়, তাদের জন্য অবশ্যই উদ্বেগজনক।
এ বৈঠক দেখিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানে প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে।
আল জাজিয়ায় প্রকাশিত আবিদ হুসাইনের প্রবন্ধ। অনুবাদ করেছেন রুবিনা আক্তার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

