কিউবায় আবারো বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। শুক্রবার দেশটির পুরো বিদ্যুৎ গ্রিডে ‘সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা’ দেখা দিলে লাখো মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।
কিউবার গ্রিড অপারেটর ইউনিওন ইলেকট্রিকা (ইউএনই) জানায়, স্থানীয় সময় শুক্রবার দুপুর ২টার কিছু আগে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়। মধ্য কিউবার খারাপ আবহাওয়ার পাশাপাশি একটি ট্রান্সমিশন ত্রুটিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিপর্যয়ের পর বিদ্যুৎ সরবরাহ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু হয়। শুক্রবার সন্ধ্যার মধ্যে রাজধানী হাভানার হাসপাতাল ও পানি সরবরাহের পাম্পিং স্টেশনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। তবে শনিবারও দেশজুড়ে বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপনের কাজ চলছিল।
ইউএনইর জাতীয় লোড ডিসপ্যাচ বিভাগের পরিচালক ফেলিক্স এসত্রাদা বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ‘ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের’ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
চলতি বছরেই অন্তত ষষ্ঠ বড় বিপর্যয়
এটি চলতি বছরে কিউবায় আঘাত হানা অন্তত ষষ্ঠ আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ বিপর্যয়। দীর্ঘদিনের পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামো, জ্বালানি সংকট এবং জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে দেশটির বিদ্যুৎব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই চাপে রয়েছে।
কিউবা জ্বালানির বড় একটি অংশ আমদানি করে। দেশটির জ্বালানি সংকট আরো তীব্র হওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও তেল সরবরাহে বাধার বিষয়টি উল্লেখ করেছে হাভানা। একই সময়ে খাদ্য ও ওষুধের সংকটও বেড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে হাসপাতাল, স্কুল ও সরকারি কার্যালয়ের কার্যক্রমেও।
হাভানার বাসিন্দা ফ্র্যাঙ্ক লরেঞ্জো রয়টার্সকে বলেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা এখন অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তার ভাষ্য, এর আগে এমন ঘটনা মাসে একবারের মতো ঘটলেও সম্প্রতি পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে।
৩৬ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষিকা লিডিয়া ফার্নান্দেজ এএফপিকে বলেন, বিদ্যুতের পাশাপাশি পানি ও রান্নার গ্যাসের সংকটও তাদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। ৭৮ বছর বয়সী ফ্রান্সিসকো রদ্রিগেজ জানান, শুক্রবার পর্যন্ত তার বাড়ি টানা ২৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিল। কয়েক দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার আশঙ্কার কথাও জানান তিনি।
বিদ্যুৎ সংকটে বিক্ষোভ
বারবার বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে কিউবায় বিরল কিছু বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটেছে। দেশটিতে অনুমোদনহীন বিক্ষোভ বেআইনি এবং এ ধরনের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। কিউবার সরকার দেশটির জ্বালানি সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে দায়ী করে আসছে। ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি তেল সরবরাহে বাধাকেও সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে হাভানা।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দেশটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে। ওয়াশিংটন কিউবার সরকারকে ঘিরে আরও ব্যাপক চাপ প্রয়োগের নীতিও অনুসরণ করছে।
ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় বাড়তি চাপ
কিউবার জ্বালানি ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মিত্র দেশ ভেনেজুয়েলার। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা কিউবাকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার ব্যারেল তেল সরবরাহ করত, যা দেশটির মোট প্রয়োজনের প্রায় অর্ধেক। তবে ভেনেজুয়েলার নিজস্ব তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পর কিউবায় সেই সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হাভানায় তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এ ছাড়া কিউবার উদ্দেশে যাওয়া কয়েকটি তেলবাহী চালান যুক্তরাষ্ট্র জব্দ করেছে। ফলে পুরোনো বিদ্যুৎ অবকাঠামো, জ্বালানি ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ—সব মিলিয়ে কিউবার বিদ্যুৎব্যবস্থা এখন বড় ধরনের সংকটের মধ্যে রয়েছে। শুক্রবারের সর্বশেষ বিপর্যয় সেই সংকটকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


