মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনো ইরান ইসরাইল হামলায় জোরালো সমর্থন জানাচ্ছেন, কখনো তিনি নিজের এই অবস্থান থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, আবার কিছু সময় পর আবারও সমর্থনে ফিরে আসছেন।
ইরান-ইসরাইল সংঘাত নিয়ে তার এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব তার অবস্থানকে অস্পষ্ট করে তুলেছে। সংঘাত যতই বাড়ছে, ততই অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
এদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, এসব হামলা "যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় করেই" চালানো হয়েছে।
তাহলে এখন প্রশ্ন হলো–– ট্রাম্প কী কী বিষয় বিবেচনায় নিচ্ছেন? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এখন তার সামনে কী কী বিকল্প পথ খোলা রয়েছে?
১. নেতানিয়াহুর চাপে নতি স্বীকার ও সংঘাত বাড়ানো
গত বৃহস্পতিবার ইসরাইল যখন তেহরানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতাদের হুমকি দেন যে ইসরাইলের পক্ষ থেকে "আরও ভয়ঙ্কর" হামলা আসবে, যেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বোমায় সজ্জিত।
নেতানিয়াহুর মতো তিনিও বলেন, ইরান পারমাণবিক বোমার মালিক হতে পারবে না।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প বলেছেন তার পছন্দের পথ (নেতানিয়াহুর মতো না) হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তি করা (এই পথটি তার নিজের দাবি করা "বিশ্বমানের চুক্তি-কারিগর" ইমেজের সঙ্গেও যায়)।
কিন্তু কীভাবে সেখানে পৌঁছাতে হবে, সে বিষয়ে তিনি দ্বিধায় ভুগেছেন। কখনো শক্তির প্রয়োগের হুমকি দিয়েছেন, কখনো জোর দিয়েছেন কূটনীতির দিকে।
ট্রাম্পের কিছু উপদেষ্টা ও সমর্থক ইরান ইস্যুতে এই "পাগল তত্ত্ব" কৌশলের পক্ষে। তাদের বিশ্বাস, এসব হুমকিই শেষ পর্যন্ত সফল হবে। কারণ তারা মনে করেন, ইরান আসলে আলোচনায় আগ্রহী না (যদিও ২০১৫ সালে ওবামার নেতৃত্বে হওয়া একটি পরমাণু চুক্তিতে ইরান স্বাক্ষর করেছিল, যেটা ট্রাম্প পরে বাতিল করে দেন)।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পকে সামরিক পথ বেছে নিতে চাপ দিয়ে আসছেন, কূটনৈতিক পথ নয়। আর ট্রাম্প শেষমেশ হয়তো ইরানের নেতৃত্বের প্রতি তার আগ্রাসী হুমকিগুলোকেই বাস্তবায়নের দিকে এগোবেন। যদিও তিনি বহুবার নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
ইসরায়েল গোপনে আরও জোরালোভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়াতে চাইতে পারে, যেন তারা মনে করে কাজটা যেন দ্রুত শেষ করা যায়।
২. মধ্যপন্থা
এখন পর্যন্ত ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইসরাইলের হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িত নয়।
তবে সংঘাত বাড়লে সেটি ট্রাম্পের জন্য বড় ঝুঁকি নিয়ে আসতে পারে, এমনকি তা তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইতোমধ্যেই আমেরিকার নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার ও স্থলভিত্তিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে ইসরাইলকে রক্ষা করতে সহায়তা করছে।
ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কিছু উপদেষ্টা হয়তো তাকে সতর্ক করছেন যে এই মুহূর্তে এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য, যা ইসরাইলের ইরানবিরোধী হামলাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। কারণ কিছু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে প্রাণঘাতী হামলা করেছে।
নেতানিয়াহু এখন বলছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনির ওপর হামলা চালালে সেটা সংঘাত বাড়াবে না, বরং সংঘাতের শেষটা এখানেই।
কিন্তু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা কিছু সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন যে তিনি এমন হামলার বিপক্ষে।
৩. সমর্থকদের চাপ এবং পেছনে সরে আসা
ট্রাম্পের মনে যেসব বড় রাজনৈতিক বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে, তার একটি হলো তার দেশের অভ্যন্তরীণ সমর্থন।
কংগ্রেসের বেশিরভাগ রিপাবলিকান সদস্য এখনো ইসরাইলকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে যাওয়া। এদের অনেকেই প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের হামলাকে সমর্থন করেছেন।
কিন্তু ট্রাম্পের 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন' বা মাগা আন্দোলনের ভেতরে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর উঠে এসেছে, যারা এখন এই 'লোহার মতো শক্ত' ইসরাইলকে সমর্থনকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করছে।
গত কয়েক দিনে তারা প্রশ্ন তুলেছেন, যেখানে ট্রাম্প "আমেরিকা ফার্স্ট" নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার মতো ঝুঁকি কেন নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
ট্রাম্পপন্থি সাংবাদিক টাকার কার্লসন শুক্রবার কড়া সমালোচনা করে লিখেছেন, প্রশাসনের দাবি যে তারা যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত নয়। কিন্তু তা সত্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইসরাইলকে নিজের মতো করে ছেড়ে দেওয়া।
তিনি বলেন, নেতানিয়াহু এবং তার 'যুদ্ধপিপাসু সরকার' এমনভাবে কাজ করছে, যাতে মার্কিন সেনারা বাধ্য হয়ে তাদের হয়ে যুদ্ধ করতে নামে।
কার্লসন লেখেন, "এই যুদ্ধে জড়ানো মানে হবে, যেসব কোটি কোটি ভোটার আশা করেছিলেন একটি সরকার আসবে যারা সত্যিই আমেরিকাকে অগ্রাধিকার দেবে, তাদের মুখের ওপর মাঝের আঙুল দেখানো।"
ঠিক একইভাবে, ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক মার্কিন কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেলর গ্রিন সোশ্যাল হ্যান্ডেল এক্সে পোস্ট করে লিখেছেন, "যারা যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরাইল/ইরান যুদ্ধের পুরোপুরি অংশ বানাতে চায়, তারা 'আমেরিকা ফার্স্ট' বা মাগা আদর্শের নয়।"
এটি ট্রাম্পের জন্য একটি বড় দুর্বলতার দিক প্রকাশ করে।
এতে তার ওপর চাপ বাড়ে ইসরাইল আক্রমণাত্মক নীতির থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার। আর কিছু কিছু প্রকাশ্য মন্তব্যে দেখাও যাচ্ছে, ট্রাম্প এই চাপের প্রতি সাড়া দিচ্ছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

