ইউক্রেনের রোবট যোদ্ধাদের কাছে হেরে যাচ্ছে শক্তিধর রাশিয়া

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ইউক্রেনের রোবট যোদ্ধাদের কাছে হেরে যাচ্ছে শক্তিধর রাশিয়া
ছবি: সিএনএন

রণক্ষেত্রে একঝাঁক ধূলিঝড়, খানিকটা বিরতি দিয়ে অস্পষ্ট স্ক্রিনের পুনর্বিন্যাস এবং এর পরই একটি বিধ্বংসী বিস্ফোরণ। ইউক্রেনের আভদিভকা ও বাখমুতের মতো রক্তক্ষয়ী নগরযুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইউক্রেনীয় কমান্ডাররা এখন বাঙ্কারে বসে মাটির নিচ থেকে এক নতুন ধাঁচের যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, যে যুদ্ধের তীব্রতা তারা কাছ থেকে অনুভব করতে পারেন না, কোনো গন্ধ পান না, এমনকি খালি চোখে দেখতেও পান না।

পূর্বাঞ্চলীয় ইউক্রেনে রাশিয়ার তিনটি ফ্রন্টলাইন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ছয়টি বিস্ফোরণ ঘটানোর পুরো অভিযানে মাটিতে কোনো ইউক্রেনীয় সেনার উপস্থিতি ছিল না। এর বদলে গেমার চেয়ারে বসে, মাথার ওপরে থাকা নজরদারি ড্রোনের লাইভস্ট্রিম দেখে এই যুদ্ধ পরিচালনা করা হচ্ছিল।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিন ধরে জনবলের সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অনিশ্চিত সহায়তার মুখে থাকা ইউক্রেনের যুদ্ধকৌশলে এক অভাবনীয় বিবর্তন ঘটেছে। দেশটির যুদ্ধপ্রচেষ্টার একটি বড় অংশ এখন চালকবিহীন রোবট, ড্রোন এবং দূরনিয়ন্ত্রিত ট্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রযুক্তি অলস ও চাপে থাকা রুশ আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে একটি আকস্মিক, যদিও ভঙ্গুর, সুবিধা এনে দিয়েছে।

গত এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন, প্রথমবারের মতো কেবল রোবট ও ড্রোনের সাহায্যে একটি রুশ ঘাঁটি দখল করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে চালকবিহীন মেশিনগুলো ২২ হাজারেরও বেশি মিশন পরিচালনা করেছে।

কম্পিউটার প্রসেসরের ফ্যানের কমলা আলো আর মাথার ওপরের মৃদু বাতির নিচে টিকে থাকার তাগিদেই এই নতুন উদ্ভাবন তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনীয় এই ইউনিট রুশ যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে জানতে পেরেছে, শত্রুপক্ষ এই রোবটগুলোকে ‘সাইলেন্ট ডেথ’ নামে ডাকে।

চার চাকার চ্যাসিসের ওপর বিশাল বিস্ফোরক বহনকারী এই রোবটগুলোর আসার শব্দ মাত্র ১০ মিটার দূর থেকে পাওয়া যায়, যা এর বিস্ফোরণের ব্যাসার্ধের একেবারেই ভেতরে।

অভিযানের সময় প্রথম রোবটটি অ্যালুমিনিয়ামের ধ্বংসস্তূপের ওপর আটকে পড়লে এর চাকাগুলো বাধা পেরিয়ে যাওয়ার জন্য সজোরে চেষ্টা করতে থাকে। অবশেষে এটি গর্তটি এড়িয়ে এগিয়ে যায় এবং ওপরের ড্রোন থেকে তোলা থার্মাল ইমেজে মাশরুম ক্লাউডের মতো আগুনের হলকা দেখা যায়। প্রথম বিস্ফোরণের পর দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে। এই প্রাথমিক আক্রমণ মূলত রুশদের মনোযোগ সরানোর জন্য করা হয়েছিল, যাতে বাকি চারটি রোবট শত্রু লাইনের পেছনে চলে যেতে পারে।

হিসাবটি খুবই সহজ, ১৬৪টি হামলার পর তৃতীয় রিলিজ ব্রিগেডের ‘এনসি ১৩’ ইউনিট হিসাব করে দেখেছে, এই রোবট আক্রমণের সমান প্রভাব তৈরি করতে তাদের ২ হাজার ৩০০ সেনার প্রয়োজন হতো। আর তেমনটা হলে হামলায় ইউনিটের অর্ধেক সৈন্য নিহত বা আহত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। সেই হিসাবে স্ক্রিনে দেখতে পাওয়া এই চালকবিহীন চলন্ত বোমাগুলো এক হাজার ইউক্রেনীয় সেনার জীবন বাঁচিয়েছে।

ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার ‘বার’ ডনবাসের নৃশংস নগর যুদ্ধের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, ‘তখনকার দিনে আমি এমন কিছু কল্পনাও করতে পারতাম না। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, তখন যদি এই সরঞ্জামগুলো থাকত, তবে আমার আরো অনেক কমরেড বেঁচে যেতেন।’

তবে ইউনিটের কমান্ডার মাইকোলা ‘মাকার’ জিনকেভিচ মনে করেন এই নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে আগের সেই পুরুষত্ব বা বীরত্বের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, ‘তখন যুদ্ধ ছিল আরো বেশি বীরত্বপূর্ণ। আপনার দক্ষতা আপনি কতটা ভালোভাবে প্রশিক্ষিত, কতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন প্রযুক্তি সবকিছু নির্ধারণ করে। আর পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। এখন পুরোটাই নির্ভর করছে চালকবিহীন, দূরনিয়ন্ত্রিত এই হত্যার জগতে কে কত দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে ও বিবর্তিত হতে পারছে তার ওপর ‘

চার বছরের রুশ আগ্রাসনে ইউক্রেনের জনসংখ্যা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তৈরি হওয়া জনবল সংকট থেকেই এই কৌশলের জন্ম। তবে কিয়েভের ড্রোনের প্রাথমিক ব্যবহার এবং এর নির্ভুলতা ও ক্ষমতার ব্যাপক শিল্পায়ন এখন মস্কোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ইউক্রেনের বর্তমান নীতি হলো প্রতি মাসে ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হত্যা বা আহত করা, যা তারা এই বছর অর্জন করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো ক্রেমলিনকে বাধ্য করা যাতে তারা শহরাঞ্চল ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে সেনা নিয়োগ করতে বাধ্য হয়, যা তাদের জন্য অস্বস্তিকর ও অপ্রীতিকর।

গত বুধবার ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ নতুন তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে, যুদ্ধে মোট রুশ নিহতের সংখ্যা ৫ লাখে পৌঁছেছে।

এই নতুন যুদ্ধের নতুন নায়ক ২৪ বছর বয়সি গোরা, যিনি নিজেকে কেবল একজন ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার’ না বলে ‘এমবেডেড হার্ডওয়্যার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। ১৮ বছর বয়সে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কিয়েভে রুশ ড্রোন হামলার কারণে ঘুমাতে না পেরে তিনি বুঝতে পারেন তার আইটি দক্ষতাই হবে নতুন ফ্রন্টলাইন।

তিনি বলেন, ‘মূল বিষয় যানবাহন নয়, মূল বিষয় হলো মানুষের মন এবং তারা এটি কীভাবে পরিকল্পনা করছে, কীভাবে তারা যানবাহনের সাথে এবং অপারেটরদের সাথে যোগাযোগ যুক্ত করছে।’

চ্যালেঞ্জগুলোও প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। যেমন একটি অভিযানে অপারেটর কমান্ডারকে জানান, ‘সালামন্ডার ৬’-এর জিপিএস বিভ্রান্ত করা হয়েছে। ফলে তারা জিপিএস ছাড়াই দিনের বেলা রেকর্ড করা ড্রোন ফিড এবং সতর্ক গবেষণার মাধ্যমে বোমায় পকমার্কড বা ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া ফসলি জমির ওপর দিয়ে পথ খুঁজে নেয়। সেখানে আরো দুটি রোবট গাছের সারির দিকে এগিয়ে যায় এবং বিধ্বংসী বিস্ফোরণ ঘটে, যেখানে আগে রুশ অবস্থানের সন্ধান মিলেছিল। তবে পঞ্চম রোবটটি একটি পরিখায় উল্টে যায় এবং ষষ্ঠটি রুশদের হাতে ধরা পড়ে।

মাটির ওপরে রোবটগুলো এখন পদাতিক বাহিনীর সাধারণ কাজগুলোও প্রতিস্থাপন করছে। 'সাইবার'-এর দল নেট দিয়ে ঢাকা একটি জায়গায় ট্যাংক ট্র‍্যাকের ওপর একটি বিশাল ব্রাউনিং হেভি মেশিনগান মাউন্ট করার কাজ করছিল। এই যানে একঝাঁক ক্যামেরা রয়েছে, যা লক্ষ্যবস্তুর বিস্তৃত দৃশ্য দেখায়। এই মেশিনগুলো দিনের পর দিন গাছের আড়ালে লুকিয়ে শিকারের অপেক্ষায় থাকতে পারে। এর পানি, খাবার বা পায়ে ক্র্যাম্প ধরার কোনো বালাই নেই।

সাইবার জানান, এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো গোলাবারুদ, ৪০০ রাউন্ড গুলি শেষ হলে এটিকে ঘাঁটিতে ফিরতে হয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা যখন শত্রুর বিরুদ্ধে এই রোবট মোতায়েন করলাম, তারা স্রেফ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল, তারা মাটিতে হামাগুড়ি দিচ্ছিল এবং বুঝতে পারছিল না কী করবে।’

সাইবারের ইউনিটে এমন পাঁচটি মেশিন রয়েছে এবং তারা ঘণ্টায় ১০ মাইল বেগে চলতে সক্ষম আরেকটি দ্রুতগতির রোবট তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা কালাশনিকভ ছোট অস্ত্র বহন করবে। ইউক্রেনের এই অটোমেশনের গতি ও পরিধি স্তম্ভিত করার মতো। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে চালকবিহীন যানগুলো বিরল কৌতূহল থেকে ফ্রন্টলাইনের স্ট্যান্ডার্ড ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, যা আহতদের উদ্ধার বা রসদ সরবরাহের কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

রুশ ড্রোনের সার্বক্ষণিক হামলার মুখে রসদ সরবরাহকারী রোবট লোড করাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ৯৩তম ব্রিগেডের সদস্যরা দ্রুঝকিভকা শহরে গাছের নিচে লুকিয়ে থাকা রোবট সরবরাহ ইউনিটের কাছে গোলাবারুদ, খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়ার জন্য দ্রুত ছুটে যান। শহরটিতে এখনো বেসামরিক মানুষ বসবাস করলেও রুশ ড্রোনের নির্ভুলতার কারণে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা সাধারণ জীবনে মিশে যেতে পারে না। একটি সাধারণ খামারবাড়িতে একটি রোবটের গায়ে পাঁচ বাক্স গোলাবারুদ বেঁধে দেওয়া হয়। মাইল দূরে বাঙ্কারে থাকা রিমোট পাইলট নিয়ন্ত্রণ নিতেই এটি চালু হয় এবং দুটি কটেজের বেড়ার মাঝখানের ছোট কাদা পথ দিয়ে ফ্রন্টলাইনের উদ্দেশ্যে তার ১০ ঘণ্টার যাত্রা শুরু করে।

এই সরবরাহগুলো অত্যন্ত জরুরি, কারণ ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনের সৈন্যরা প্রায়ই তাদের শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছেন। ২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের দুই সেনা সদস্য 'ক্রো' এবং 'ক্রিপি' যথাক্রমে ৩৪৪ দিন এবং ৩৩৪ দিন বিরতিহীনভাবে ফ্রন্টলাইনের পরিখায় কাটিয়েছেন। ক্রোর চোখের দীর্ঘ দৃষ্টি ও হাঁটার ধরণ তার কষ্টের কথা জানান দিচ্ছিল, যা আজ ভোরে শেষ হয়েছে যখন তিনি নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ১২ ঘণ্টায় ২০ মাইল হাঁটা শুরু করেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমার সন্তান এবং স্ত্রীই কেবল আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, অন্যথায় আমি অনেক আগেই পাগল হয়ে যেতাম।’

ক্রো শিগগিরই বাড়ি ফিরবেন, তবে তার ৯ বছরের ছেলের জন্মদিন একদিনের জন্য মিস করেছেন। পজিশনে যাওয়ার পর থেকে স্ত্রীর সাথে তার কোনো সরাসরি কথা হয়নি, শুধু রেডিওতে মেসেজ রেকর্ড করে পাঠাতেন।

অন্যদিকে 'ক্রিপি' জানান, ড্রোন হামলার মাত্রা এতটাই ছিল যে মাটি দিয়ে বস্তা ভর্তি করে প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করার সময়টুকুও তারা পাচ্ছিলেন না। বস্তা ফুরিয়ে গেলে তারা নিজেদের বাঁচাতে যা পেতেন তা দিয়েই মাথা ঢাকতেন।

ক্রামাতোরস্ক শহরে বসে যখন এই দুই ব্যক্তি প্রায় এক বছর পর সোডা প্রাণ করছিলেন এবং পরিষ্কার কাপড়ের কথা ভাবছিলেন, তখনই মাথার ওপরে আরেকটি ড্রোন ওড়ার শব্দ শোনা যায় এবং স্থানীয়রা দিগ্বিদিক ছুটে পালাতে থাকে। এই চালকবিহীন মেশিনগুলো এখন সর্বত্র উপস্থিত এবং তারাই এই যুদ্ধকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।

সূত্র: সিএনএন

এম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন