ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু স্থল, সমুদ্র কিংবা আকাশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—মহাকাশও হয়ে উঠতে পারে সংঘাতের নতুন ক্ষেত্র। এমন আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে চাঁদের আশপাশের মহাকাশেও সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। এতে মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও ভবিষ্যৎ যুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে আয়োজিত অ্যারোস্পেস, স্পেস অ্যান্ড সাইবার সম্মেলনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের পরিধি এখন আর শুধু পৃথিবীতে সীমাবদ্ধ নেই। সমুদ্রের গভীর তলদেশ থেকে শুরু করে চাঁদের কক্ষপথ পর্যন্ত সংঘাতের ক্ষেত্র বিস্তৃত হতে পারে। এ জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকা এবং প্রয়োজনে জয়ী হওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।
পৃথিবী ও চাঁদের কক্ষপথের মধ্যবর্তী বিস্তৃত মহাকাশ অঞ্চলকে বলা হয় ‘সিসলুনার স্পেস’। সহজভাবে বললে, পৃথিবীর চারপাশের মহাকাশ থেকে চাঁদের কক্ষপথ এবং তার সামান্য বাইরের অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাই এর অন্তর্ভুক্ত। ভবিষ্যতের সামরিক প্রতিযোগিতায় এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা।
মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জেনারেল ড্যান কেইনের এই বক্তব্য সামনে আসে। ফলে ওয়াশিংটনের মহাকাশকেন্দ্রিক সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সামরিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশেও নিজেদের সামরিক উপস্থিতি আরো বাড়াতে চাইছে।
মার্কিন স্পেস ফোর্সের কমব্যাট ফোর্সেস কমান্ডের প্রধান জেনারেল গ্রেগরি গ্যাগননও জানিয়েছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্য তাদের সামরিক বাহিনী প্রস্তুতি নিচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মানবসভ্যতা পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশের আরো গভীরে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ দেশগুলো ভবিষ্যতের সংঘাতে মহাকাশকে গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আর সে কারণেই মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে ওয়াশিংটন।
এই প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পেস ফোর্স’। ২০১৯ সালে পেন্টাগনের অধীনে এটি গঠন করা হয়। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে নতুন এই শাখার দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে সামরিক মহাকাশ অভিযান পরিচালনা, উপগ্রহের ওপর নজরদারি, মহাকাশসম্পদ সুরক্ষা এবং মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কার্যক্রম বজায় রাখা।
চাঁদ নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওই অঞ্চলের কিছু জায়গায় সূর্যের আলো প্রায় পৌঁছায় না। বিজ্ঞানীদের ধারণা, স্থায়ী ছায়ায় থাকা এসব এলাকায় জলীয় বরফ থাকতে পারে। ভবিষ্যতে সেই বরফ থেকে পানীয় জল, অক্সিজেন এবং রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
তবে মহাকাশে সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি প্রশ্নও রয়েছে। ১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুযায়ী, চাঁদ ও অন্যান্য মহাকাশীয় বস্তু শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। চাঁদ বা মহাকাশে গণবিধ্বংসী অস্ত্র স্থাপনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে চাঁদে সামরিক ঘাঁটি কিংবা সামরিক কার্যক্রম বাড়লে তা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এর পাশাপাশি মহাকাশে সংঘাত হলে তৈরি হতে পারে বিপজ্জনক মহাকাশ বর্জ্য। উপগ্রহ ধ্বংসের মতো কোনো ঘটনা ঘটলে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ কক্ষপথে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসব বর্জ্য একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে আরও ধ্বংসাবশেষ তৈরি করতে পারে, যা পৃথিবীর চারপাশে থাকা মহাকাশযান ও উপগ্রহের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
মহাকাশে সামরিক প্রতিযোগিতা নিয়ে চীনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ২০২৪ সালে বেইজিং নিজেদের সামরিক মহাকাশ বাহিনী গঠন করলেও মহাকাশকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার বা অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং মহাকাশযুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করা উচিত।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


