ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন একটি বিবৃতি দিয়েছেন।
তিনি ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “চুক্তিটি আগামীকাল (রোববার) স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে এবং চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।”
আরেক পোস্টে বলেছেন, পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি শান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে গিয়ে বি-২ বোমারু বিমানের হামলায় ভূগর্ভে চাপা পড়ে যাওয়া পারমাণবিক ধুলাবালি সংগ্রহ করবে।
তিনি বলেন, সেগুলোকে নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করে ধ্বংস করা হবে—তা ইরানে হোক বা যুক্তরাষ্ট্রে। আমরা ভবিষ্যতে দীর্ঘ সময় ধরে ইরান এবং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা করি।”
ট্রাম্প আরও বলেন, “আশা করি এই প্রক্রিয়া দ্রুত, সহজ ও মসৃণভাবে সম্পন্ন হবে। যদি তা না হয়, তাহলে আমাদের কাছে চূড়ান্ত বিকল্প রয়েছে, যা আশা করি আর কখনো ব্যবহার করতে হবে না।”
ট্রাম্পের কিছু মন্তব্য ইরানি বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি ইরান। ট্রাম্পের মন্তব্যের কয়েকটি দিক ইরানি কর্মকর্তাদের আগের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের সময়সূচি নিয়ে উভয় পক্ষের অবস্থানে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক আলমিগদাদ আলরুহাইদ বলেন, তেহরান স্বীকার করেছে যে আলোচনা ইতিবাচক গতিতে এগোচ্ছে এবং খসড়া চুক্তির পাঠ চূড়ান্ত করতে কাজ চলছে। এ বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক রোববার স্বাক্ষরিত হবে না। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এটি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান আলোচনা আশাবাদের মাত্রা বেশি : বিশ্লেষক
এদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলের গবেষণা প্রতিষ্ঠান গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক ড. দানিয়া থাফের বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার বর্তমান পর্যায়ে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আশাবাদের মাত্রা বেশি।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন পক্ষের ইতিবাচক সংকেত আলোচনাকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়েছে। তবে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাধা রয়ে গেছে।
থাফার বলেন, ‘এখনো অনেক বিষয় বিবেচনায় রয়েছে, তবে আমরা আগের চেয়ে সমঝোতার অনেক কাছাকাছি পৌঁছেছি।’ তবে লেবাননে চলমান সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং সেখানে যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে স্টারমারের ফোনালাপ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইরান-সংক্রান্ত সম্ভাব্য চুক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, যেকোনো সমঝোতা যেন ‘টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি’ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্টারমারের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য যেকোনো শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সহায়তা করতে প্রস্তুত এবং এর সফলতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, স্টারমার ও ট্রাম্প উভয়েই একমত হয়েছেন যে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে সমুদ্রপথে অবাধ নৌ-চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
দুই নেতা ভবিষ্যতেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তি নিয়ে আশাবাদী ইরানের সাধারণ জনতা
সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশাবাদী মনোভাব দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ফোয়াদ আজাদি। তেহারান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক বলেন, দেশটির অধিকাংশ মানুষ মনে করেন আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে।
তবে আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আজাদি বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা রোববার চুক্তি স্বাক্ষর এড়িয়ে যেতে চাইতে পারেন, কারণ দিনটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর জন্মদিন। তার মতে, ‘ইরান এমন পরিস্থিতি চায় না যেখানে ট্রাম্প দাবি করতে পারেন যে তিনি ইরানের কাছ থেকে জন্মদিনের উপহার পেয়েছেন, কারণ তিনি গুরুতর যুদ্ধাপরাধে জড়িত।’
আজাদি আরও বলেন, কোনো চুক্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে প্রকৃত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। তার মতে, ওয়াশিংটন যতদিন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার নীতি অনুসরণ করবে, ততদিন এ সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না।
তিনি দাবি করেন, ‘ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড যতদিন ইসরাইলের দখলে থাকবে এবং যতদিন এই দুই রাষ্ট্রের নেতৃত্ব গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের হাতে থাকবে, ততদিন ইরান তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ বা স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না।’
একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, চলমান সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো স্থায়ীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।
আশাবাদ থাকলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো রস হ্যারিসন সতর্ক করে বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আশাবাদী বক্তব্য সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া উচিত হবে না।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হ্যারিসন বলেন, ‘এর আগেও আমরা এমন পরিস্থিতি দেখেছি, যখন চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে সমঝোতা হতে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে গেছে।’
তবে তিনি মনে করেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার আলোচনায় উভয় পক্ষের আন্তরিকতা বেশি দেখা যাচ্ছে। তার ভাষায়, ‘ওয়াশিংটন ও তেহরানে এমন এক ধরনের গুরুত্ব ও আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে, যা আমরা আগে দেখিনি।’
হ্যারিসনের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য মন্তব্যগুলো আলোচনাকে ঘিরে জনমত ও রাজনৈতিক বার্তা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার অংশও হতে পারে। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনার বয়ান বা জনধারণা নিয়ন্ত্রণ করার একটি প্রবণতা কিংবা স্বভাব রয়েছে বলে মনে হয়।’
তার মন্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আশাবাদ থাকলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


