অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতিতে নতুন প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক

অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতিতে নতুন প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক

অস্ট্রেলিয়ার ডানপন্থী দল ওয়ান নেশনের নতুন অভিবাসন নীতির কিছু প্রস্তাব গুরুতর আলোচনার দাবি রাখে বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অ্যালান গ্যামলেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, দলটির কিছু কঠোর ও শাস্তিমূলক প্রস্তাব অর্থনীতি ও সমাজে নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে।

গ্যামলেনের মতে, ওয়ান নেশনের প্রস্তাবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অস্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা ও গঠন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ। তার যুক্তি, অস্থায়ী অভিবাসনের পরিমাণের সঙ্গে আবাসন পরিকল্পনা, সামাজিক একীভূতকরণ এবং অভিবাসী শ্রমিকদের শোষণের মতো বিষয় সরাসরি যুক্ত। তাই শুধু মোট অভিবাসন সংখ্যা বা ‘নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন’ দিয়ে সমস্যাটি বিচার করলে বাস্তব পরিস্থিতির অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়।

বিজ্ঞাপন

অস্ট্রেলিয়ায় অস্থায়ী অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সরকারের হাতে মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে—অস্থায়ী ভিসায় কতজন নতুন করে প্রবেশ করবে এবং তাদের কতজন পরবর্তী সময়ে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পাবে। এই দুই প্রবাহের মধ্যে ভারসাম্য রাখা গেলে অস্থায়ী অভিবাসীর মোট সংখ্যা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব।

তবে ওয়ান নেশনের প্রস্তাবের সমালোচনাও করেছেন গ্যামলেন। দলটি তিন বছরের মধ্যে অস্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা ৭ লাখ ৫০ হাজার কমানোর পরিকল্পনা করেছে। এর ফলে নেট অভিবাসন নেতিবাচক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তার মতে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় সীমান্ত বন্ধ থাকায় অস্ট্রেলিয়ায় যে ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধাক্কা তৈরি হয়েছিল, ইচ্ছাকৃতভাবে একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা ঝুঁকিপূর্ণ।

অভিবাসীদের দেশত্যাগের ক্ষেত্রেও ওয়ান নেশনের প্রস্তাবকে অতিরিক্ত কঠোর বলে মনে করেন তিনি। বৈধভাবে থাকার অধিকার শেষ হয়ে গেলে কাউকে দেশ ছাড়তে হবে—এটি স্বাভাবিক অভিবাসন আইনের অংশ। কিন্তু তিন মাসের সময়সীমা, কঠোর প্রয়োগ এবং আজীবন পুনঃপ্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা ব্যক্তির পারিবারিক পরিস্থিতি, দীর্ঘদিনের বসবাস এবং আইনি প্রক্রিয়ার মতো বিষয়গুলো যথেষ্ট বিবেচনা করে না বলে তার মত।

ওয়ান নেশনের অভিবাসন নীতিতে জাতিগত বিভাজনের ঝুঁকির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। গ্যামলেনের মতে, অভিবাসনের মাত্রা বেশি কি না বা অস্থায়ী অভিবাসন আরো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন কি না—এসব নিয়ে আলোচনা বৈধ। কিন্তু আবাসন সংকট, সরকারি সেবা, জীবনযাত্রার মান, অপরাধ বা নিরাপত্তার জন্য নির্দিষ্ট জাতিগত বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা তথ্যভিত্তিক নীতি আলোচনাকে দুর্বল করে এবং সামাজিক বিভাজন বাড়ায়।

তিনি মনে করেন, কোভিড-পরবর্তী অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থাকে নতুন করে ভারসাম্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। অস্থায়ী অভিবাসীদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতি থাকা দরকার—কোন উদ্দেশ্যে তারা আসবে, কতদিন থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের দেশে ফিরে যেতে হবে নাকি স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়া হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী স্থায়ী হওয়ার বাস্তবসম্মত পথ এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হলে নিরাপদ ও মানবিকভাবে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থাও থাকা উচিত।

গ্যামলেন আরো একটি স্বাধীন জাতীয় অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, এমন একটি প্রতিষ্ঠান নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন অভিবাসন নীতির সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক দাবিগুলোকে গবেষণালব্ধ তথ্যের মাধ্যমে যাচাই করতে পারে। অভিবাসন অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি ও সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই এটি স্লোগান, ইচ্ছামতো সংখ্যা নির্ধারণ বা কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে দায়ী করার মাধ্যমে পরিচালিত না করে তথ্য, গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে পরিচালনা করা উচিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন