গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ চুক্তির ফলে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হবে না বলে জানিয়েছে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড। চুক্তিতে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও স্বীকার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার চুক্তির ঘোষণা দিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ‘স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ পাবে। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা বহাল থাকবে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেন, চুক্তিটি ডেনমার্ক রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেনও বলেছেন, চুক্তির মাধ্যমে আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং একই সঙ্গে ডেনমার্কের নির্ধারিত সীমারেখা সম্মান করা হবে।
চুক্তির আওতায় গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক উপস্থিতি গড়ে তোলার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোকে সেখানে নিজস্ব সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ না দেওয়ার বিষয়টিও চুক্তিতে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ঠিক কতটা বাড়বে, কতজন সেনা মোতায়েন করা হবে কিংবা নতুন কোনো সামরিক স্থাপনা কোথায় তৈরি হবে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
চুক্তিটির আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও স্পষ্টতা নেই। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রনীতি বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা পাবে কি না, তা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশের পর এর প্রকৃত পরিধি আরও পরিষ্কার হবে।
গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলের অত্যন্ত কৌশলগত একটি ভূখণ্ড। এর ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। বরফ গলার কারণে আর্কটিক অঞ্চলে নতুন নৌপথের সম্ভাবনাও বাড়ছে। এসব কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রিনল্যান্ডের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আগ্রহ বেড়েছে।
গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। শীতল যুদ্ধের সময় সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি ছিল। বর্তমানে দেশটি গ্রিনল্যান্ডের উত্তরে পিটুফিক স্পেস বেসে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। এই ঘাঁটি ক্ষেপণাস্ত্র পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্কের মধ্যে কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা চলছিল। ট্রাম্প এর আগে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন এবং সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো মিত্রদের মধ্যে সম্পর্কের ওপর চাপ তৈরি হয়। পরে ডেনমার্কসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ গ্রিনল্যান্ডে সামরিক সদস্য পাঠায়।
নতুন চুক্তিটি সেই দীর্ঘ উত্তেজনা কমানোর একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ন্যাটোর পক্ষ থেকেও চুক্তিকে স্বাগত জানানো হয়েছে। জোটটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
চুক্তিটি আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এটি কার্যকর হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় অনুমোদনের বিষয়ও রয়েছে।
ফলে আপাতত গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনেই থাকছে এবং এর জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও বহাল থাকছে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কৌশলগত উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার পথ তৈরি হয়েছে। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশের পরই বোঝা যাবে, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন ভূমিকা বাস্তবে কতটা বিস্তৃত হবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


