গাজায় ৭০০ তাঁবুতে পাঠদান চলছে ৫ লাখ শিক্ষার্থীর

গাজায় ৭০০ তাঁবুতে পাঠদান চলছে ৫ লাখ শিক্ষার্থীর

তিন বছর বন্ধ থাকার পর গাজা উপত্যকায় নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে। তবে যুদ্ধের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে স্বাভাবিক শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারছে না অধিকাংশ শিক্ষার্থী। স্কুল ভবন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৫ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য গড়ে তোলা হয়েছে তাঁবুভিত্তিক অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ। শনিবার গাজা সিটিতে এসব তাঁবুতে শিক্ষার্থীদের পাঠ নিতে দেখা গেছে।

ফিলিস্তিনের শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজা উপত্যকাজুড়ে প্রায় ৭০০টি তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে। এসব অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্রে এমন শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাদের নিয়মিত স্কুল যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত, ধ্বংস অথবা বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে গাজায় প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন শিক্ষাবর্ষে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং অনলাইন—দুই পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গাজার ভেতরে যারা সরাসরি ক্লাসে অংশ নিতে পারছে না এবং উপত্যকার বাইরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রায় ৭০ হাজার শিক্ষার্থী গাজার ভেতর থেকে এবং ২০ হাজার শিক্ষার্থী গাজার বাইরে থেকে অনলাইন শিক্ষায় যুক্ত হবে।

তবে সরাসরি শিক্ষাদানই প্রধান পদ্ধতি হিসেবে রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৭০০টি শিক্ষাকেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে এবং আরো ২৫টি অস্থায়ী স্কুল শিগগির চালু করার কথা জানিয়েছে ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রচণ্ড গরমের পাশাপাশি তাঁবু ও অস্থায়ী স্থাপনায় শিক্ষাদানের কারণে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময়ও পিছিয়েছে।

যুদ্ধের আগে গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউ জানিয়েছে, গাজার প্রায় ৯২ শতাংশ স্কুল ভবন সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। প্রায় ৬ লাখ ৫৮ হাজার শিশু যথাযথ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

যুদ্ধের কারণে শুধু স্কুল ভবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, শিক্ষা কার্যক্রমের সময়ও ব্যাপকভাবে কমেছে। ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৩–২০২৬ সময়ে বছরে স্বাভাবিক ২০০ শিক্ষাদিবস থেকে তা কমে প্রায় ৬০ দিনে নেমে এসেছে। সাপ্তাহিক ক্লাসের সময়ও ৩০ ঘণ্টা থেকে ১২ ঘণ্টায় কমেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে লক্ষ্য শুধু স্কুল পুনর্নির্মাণ নয়; বরং এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা, যা যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া শেখার ঘাটতিও পূরণ করতে পারে। এ জন্য অস্থায়ী শিক্ষাকেন্দ্র, তাঁবু, আংশিকভাবে ব্যবহারযোগ্য স্কুল এবং অনলাইন শিক্ষাকে মিলিয়ে একটি ‘নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি পূরণ। গাজার আল-আকসা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও জরুরি পরিস্থিতিতে শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ওমর দাহলান মনে করেন, দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল শিক্ষার পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় শিশুদের মৌলিক শেখার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর মতে, শুধু দ্রুতগতিতে পুরোনো পাঠ শেষ করার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের কোন কোন মৌলিক দক্ষতা হারিয়েছে, তা নির্ণয় করে পৃথকভাবে তা পূরণের ব্যবস্থা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষগুলোতেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। গাজার আল-হাদারা স্কুলে শিক্ষার্থীরা ছোট তাঁবুতে দুই শিফটে ক্লাস করে এবং অনেক শিক্ষার্থী মেঝেতে বসে লেখাপড়া করে। পর্যাপ্ত বেঞ্চ-চেয়ার, বই, খাতা, কলম ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণেরও ঘাটতি রয়েছে।

তবু দীর্ঘ বিরতির পর শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। গাজার নতুন শিক্ষাবর্ষ তাই শুধু পাঠদান পুনরায় শুরুর ঘটনা নয়; যুদ্ধের কারণে ভেঙে পড়া একটি শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে সীমিত সম্পদে আবার সচল হওয়ার চেষ্টা করছে, তারও একটি চিত্র হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদনটিতে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিহতের সংখ্যা বা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত যুদ্ধ-সংক্রান্ত বর্ণনাকে মূল বিষয় না করে শিক্ষা সংকটকে কেন্দ্র করা হয়েছে; যেখানে সংখ্যা বা পরিস্থিতির তথ্য নেওয়া হয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট সূত্রের উল্লেখ রাখা হয়েছে।

সূত্র: কাতার নিউজ এজেন্সি, মিডল ইস্ট মনিটর ও এল পায়েস ইংলিশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন