তৃতীয় মাসে পদার্পণ করেছে ইরান যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে চীন। যুদ্ধের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা কীভাবে কাজ তা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাচ্ছে দেশটি।
চীন, তাইওয়ান ও অন্যান্য স্থানের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে সিএনএন। তারা চীনকে তার নিজের শক্তি সম্পর্কে ধারণা, অভিজ্ঞতার অভাব এবং ইরান যুদ্ধ ও তার পরিণতি সম্পর্কে একটি অতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আঁকড়ে থাকার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
চীনের বিমান বাহিনীর সাবেক কর্নেল ফু কিয়ানশাও বলেছেন, এখন পর্যন্ত চলা লড়াই থেকে তার প্রধান উপলব্ধি হলো, পিপলস লিবারেশন আর্মি তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা ভুলে যেতে পারে না। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান কীভাবে প্যাট্রিয়ট বা টার্মিনাল হাই-অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্সের (থাড) মতো মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থাগুলোকে ফাঁকি দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করেছে।
ফু সিএনএনকে বলেন, ‘ভবিষ্যতের যুদ্ধে আমরা যেন অপরাজেয় থাকতে পারি, তা নিশ্চিত করতে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে।’
পিএলএ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত তার আক্রমণাত্মক যুদ্ধক্ষমতা বাড়িয়েছে। তারা এমন ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করেছে যেগুলোতে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল রয়েছে এবং যা ইন্টারসেপ্টর ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী প্ল্যাটফর্মগুলোকে ফাঁকি দিতে পারে।
ব্রিটিশ থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আরইউএসআইয়ের মতে, পিএলএ বিমান বাহিনী দ্রুত গতিতে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার যুক্ত করছে এবং দূরপাল্লায় নির্ভুল হামলা চালানোর জন্য প্রায় এক হাজারটি জে-২০ জেট মোতায়েন করবে, যা অনেকটা মার্কিন এফ-৩৫ এর সমতুল্য।
কিন্তু তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান অপেক্ষাকৃত আদিম প্রযুক্তি, যার মধ্যে স্বল্পমূল্যের শাহেদ ড্রোন এবং আরো কম খরচের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত ব্যবহার করে পারস্য উপসাগরে মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিল।
এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এফ-৩৫ এবং বি-২-এর মতো অনেক বেশি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ইরানের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি বি-১, বি-৫২ ও এফ-১৫ থেকে ফেলা সস্তা ও কম উন্নত প্রযুক্তির গাইডেড যুদ্ধাস্ত্রও ব্যবহার করেছে। তারা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক থেকে শুরু করে নৌযান ও সেতু পর্যন্ত সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে।
ফু বলেন, এটি এমন একটি মিশ্রণ যার জন্য বেইজিংকে পরিকল্পনা করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘হামলা ও আক্রমণ থেকে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান, বিমানঘাঁটি এবং বন্দরগুলোকে কার্যকরভাবে রক্ষা করার জন্য আমাদের আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে।’
যখন যক্তরাষ্ট্র-চীন সম্ভাব্য সংঘাতের প্রসঙ্গ আসে, তখন তাইওয়ানকে প্রায়শই একটি সম্ভাব্য সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখা হয়।
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি স্বশাসিত তাইওয়ানকে সংযুক্ত করার অঙ্গীকার করেছে, যদিও তারা কখনোই তাইওয়ানকে নিয়ন্ত্রণ করেনি। চীনা নেতা শি জিনপিং এর জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করেননি।
তাইওয়ানে বিশ্লেষকরা স্বীকার করেন যে, চীন এমন একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে যা উচ্চ প্রযুক্তির নিখুঁত অস্ত্রধারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং স্বল্প খরচের ড্রোন সক্ষমার ইরান—উভয়েরই সমকক্ষ।
তাইওয়ানের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের সহযোগী গবেষক চিয়ে চুং সিএনএনকে বলেন, ‘তাইওয়ানের বিরুদ্ধে চীনের যৌথ সামরিক অভিযানে দূরপাল্লার রকেট এবং ড্রোনের ঝাঁক অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’
কিন্তু তাইওয়ান প্রণালির ওপারে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য সেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা কি যথেষ্ট হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, চীন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ড্রোন নির্মাতা এবং এর নির্মাতারা যে বিপুল সংখ্যক ড্রোন উৎপাদন করতে পারে, তা বিস্ময়কর।
কেউ কেউ সতর্ক করেছেন যে, তাইওয়ান এটা মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত নয়।
একটি সরকারি নজরদারি সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের সামরিক বাহিনীর বর্তমান ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা ‘অকার্যকর’। এটা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটিগুলোর জন্য একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
তবে তাইওয়ান হাত গুটিয়ে বসে নেই এবং এই প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো উন্নত করার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তাইওয়ানের প্রধান ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘থান্ডার টাইগার’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিন সু, তাইওয়ানের ড্রোন সক্ষমতায় আরো বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।
যদি তাইওয়ান নিয়ে কোনো সংঘাত হয়, তবে দ্বীপরাষ্ট্রটি বা যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন ব্যবহার করে তাইওয়ান প্রণালি পেরিয়ে আক্রমণ ও দখলের উদ্দেশ্যে আসা চীনা জাহাজ বা বিমানকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
শত্রুরও শিখছে
ইরান যুদ্ধ থেকে শিক্ষা গ্রহণকারী সকল সামরিক বাহিনীর জন্য এটাই মূল বিষয়: আপনার শত্রুও শিখছে। তারা সেই শিক্ষা এমনভাবে প্রয়োগ করতে পারে যা আপনি কল্পনাও করেননি।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই মাসেরও বেশি সময় পরেও, অনেক বিশ্লেষক এখনো এটা ভেবে অবাক হচ্ছেন যে ওয়াশিংটনের যুদ্ধকালীন নেতারা হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধের জন্য কোনো পরিকল্পনা করেননি।
অন্যরা ভাবছেন, এত বড় সামরিক আঘাত সহ্য করার পরেও ইরান সরকার কীভাবে এখনো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তারা বেইজিংয়ের জন্য স্পষ্ট শিক্ষা দেখতে পাচ্ছেন।
ইন্ডেপেন্ডেন্ট সংস্থা ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রেইগ সিঙ্গেলটন সিএনএনকে বলেন, ‘কৌশলগত জয় মানেই রাজনৈতিক ফলাফল নয়।’
তিনি বলেন, ‘চীনের জন্য এটা একটা শিক্ষা: যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনাকে কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত ফলাফল এনে দেবে, এমনটা নাও হতে পারে।’
এরপর এমন একটি জিনিস আছে যা চীনা সামরিক বাহিনীর একেবারেই নেই: যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিয়েতনামের সাথে যুদ্ধের পর থেকে পিএলএ আর সরাসরি গোলাগুলির মুখোমুখি হয়নি। তারপর থেকে, মার্কিন বাহিনী ইরাকে দুইবার ও আফগানিস্তানে ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে এবং কসোভো ও পানামার মতো জায়গায় যুদ্ধ পরিচালনা করেছে, যা কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।
ইরান সংঘাত প্রসঙ্গে চীনা সামরিক বিশ্লেষক সং জোংপিং বলেন, ‘প্রকৃত যুদ্ধ দেখতে এমনই হয়।’
আগামী দশকে চীন যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সংঘাতে জড়ায়, তবে ওয়াশিংটনের কাছে এমন বিপুল সংখ্যক কর্মী থাকবে যারা বর্তমান পারস্য উপসাগরীয় সংঘাতে বা এই অভিযানের পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছিলেন। তারা সহযোদ্ধা হারিয়েছে, সম্পদ হারিয়েছে, বিপুল বিজয় অর্জন করেছে এবং উচ্চ পর্যায়ে নিখুঁত যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। তারা পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, পিএলএ একইভাবে পরিবর্তনশীল যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে কত দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে, তা এখনো দেখার বিষয়।
আরএ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



ট্রাম্পের চীন সফর এ সপ্তাহেই, নিশ্চিত করল বেইজিং
ভ্যান্স নাকি রুবিও, কে হচ্ছেন ট্রাম্পের উত্তরসূরি