যৌন অসদাচরণের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি করিম খানকে পদে থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব স্টেটস পার্টিজ’ ভোটাভুটির মাধ্যমে তাকে অপসারণের এই সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে করিম খানের আইনি দল এ পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে লিখেছেন, করিম খানের বিরুদ্ধে এ ঘটনা ‘স্পষ্টতই আইসিসির বিরুদ্ধে পরিচালিত বৃহত্তর আক্রমণের অংশ’।
ইসরাইলি নেতাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা ও রাজনৈতিক চাপ
২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন করিম খান। পরে ওই বছরের শেষ দিকে আইসিসির বিচারকেরা সেই পরোয়ানা আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করেন।
এ পরোয়ানা জারির পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের তীব্র তোপের মুখে পড়েন করিম খান। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন করিম খানসহ আইসিসির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করে। এমন সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল শুক্রবার তাকে অপসারণের প্রশ্নে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয়।
তবে নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে জারি করা পরোয়ানার ওপর এ সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না। কারণ, পরোয়ানা প্রত্যাহারের এখতিয়ার কেবল আইসিসির বিচারকদেরই রয়েছে। অবশ্য এই অপসারণের পর আইসিসির তদন্তের সমালোচনায় নতুন করে সরব হয়েছেন ইসরাইলি কর্মকর্তারা।
প্রমাণ না মেলা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রশ্ন
করিম খানের আইনি দলের প্রধান তায়াব আলী জানান, জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ তদারকি দপ্তর (ওআইওএস)–এর তদন্তে করিম খানের বিরুদ্ধে কোনো অসদাচরণ বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একটি স্বাধীন জুডিশিয়াল প্যানেলও সর্বসম্মতভাবে একই সিদ্ধান্ত দিয়েছিল।
তায়াব আলি অভিযোগ করেন, ‘করিম খানকে এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে, যেখানে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ন্যায্য সুযোগ দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ পর্যালোচনা করা স্বাধীন বিচারকদের সিদ্ধান্তকেও উপেক্ষা করা হয়েছে।’
তার মতে, এ সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তিগত সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর গড়াবে। আইসিসির স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে অন্যায্য কিংবা স্বাধীন জুডিশিয়াল বডির সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এ ধরনের অপসারণ প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকা উচিত।
অভিযোগের পটভূমি
অভিযোগ প্রথম প্রকাশ্যে আসার প্রায় দুই বছর পর সদস্যরাষ্ট্রগুলো করিম খানকে অপসারণের অনুমোদন দিল। ৫৬ বছর বয়সি এই ব্রিটিশ ব্যারিস্টার গত জুনে নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। এর আগে আইসিসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পরিষদের একটি তদারকি প্যানেল সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে তিনি ‘গুরুতর অসদাচরণ’ করেছেন।
করিম খানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা নারী—যার পরিচয় কেবল ‘সারাহ’ নামে প্রকাশ করা হয়েছে—সম্প্রতি সিএনএনকে জানান, করিম খানের আচরণ ধীরে ধীরে স্পর্শকাতর ও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তিনি ঘুমের ভান করে থাকাকালে করিম খান তার শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ করেন বলে দাবি করেন।
করিম খান শুরু থেকেই এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে আসছেন। তার আইনজীবীদের দাবি, যে প্রক্রিয়ায় ভোটাভুটি হয়েছে, তা ছিল অন্যায্য ও প্রমাণহীন।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
আইসিসি গতকাল জানিয়েছে, আপাতত করিম খানের দপ্তরের দায়িত্ব যৌথভাবে পালন করবেন উপপ্রধান কৌঁসুলি নজহাত শামিন খান ও মামে মান্দিয়ায়ে নিয়াং।
করিম খানকে অপসারণের মধ্য দিয়ে এখন নতুন আইসিসি প্রধান কৌঁসুলি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে এ বিষয়ে নতুন ভোট আগামী বছরের আগে হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

