মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তরুণদের কেবল ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনা ও সমাজ পরিবর্তনের অংশীদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে তরুণদের নেতৃত্ব, মানসম্মত শিক্ষা, অর্থনৈতিক সুযোগ, বহুজাতিক সমাজে ঐক্য, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে দক্ষতা অর্জনের বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের খাদ্যসংকট এবং শিক্ষার ব্যয় সামাল দিতে সরকারের সম্ভাব্য উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি। এসব বক্তব্য ও উদ্যোগের মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্মাণে তরুণদের শুধু জনসংখ্যাগত শক্তি নয়, নীতিনির্ধারণের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনার একটি প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।
২০২৬ সালের ৩ অক্টোবর কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টারে ইয়ুথ ইকোনমিক ফোরাম (ওয়াইইএফ) ২০২৬-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে এবং ১১ অক্টোবর কুয়ালালামপুরে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ইন্টারন্যাশনাল ইয়াং ফিউচার লিডার্স সামিটে আনোয়ার তরুণদের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেন। দুই অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল—তরুণদের নেতৃত্বের জন্য ভবিষ্যৎ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না; দেশের বর্তমান সমস্যার সমাধানেও তাদের দায়িত্ব নিতে হবে। ১২ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য স্টার-এর প্রতিবেদনেও তরুণদের বর্তমানের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার এই আহ্বান তুলে ধরা হয়।
আনোয়ারের এই দৃষ্টিভঙ্গির তাৎপর্য শুধু তরুণদের উৎসাহিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রাষ্ট্র ও সমাজে প্রজন্মগত সম্পর্কের পরিবর্তন—যেখানে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব তরুণদের কেবল নির্দেশনা দেবে না, বরং তাদের মতামত, উদ্ভাবনী চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দেবে। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে বক্তব্যের পাশাপাশি নীতি, বাজেট, প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির কাঠামোয় কতটা পরিবর্তন আসে, তার ওপর।
শিক্ষার সুযোগ ও ক্ষুধামুক্ত ক্যাম্পাসের প্রশ্ন
তরুণবান্ধব নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো শিক্ষার সুযোগকে বাস্তব জীবনের সামর্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মানেই যে একজন শিক্ষার্থী নির্বিঘ্নে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন, বাস্তবতা তা নয়। খাবার, আবাসন, যাতায়াত, বই ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণের ব্যয় অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আনোয়ার ৩ অক্টোবর জানান, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী খাবারের অভাবে পড়াশোনায় ব্যাহত হচ্ছেন, তাদের সহায়তার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। ২০২৭ সালের বাজেটে এ বিষয়ে উদ্যোগ ঘোষণার ইঙ্গিতও দেন তিনি।
আনোয়ারের বক্তব্যে শিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতার বিষয়টিও এসেছে। মালয় ভাষার ওপর দক্ষতা বজায় রেখে ইংরেজি এবং চীনা, তামিল, আরবি, ফরাসি ও জার্মানসহ অন্যান্য ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলেছেন তিনি। তার বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, তরুণদের স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত থাকার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্ঞান, গবেষণা ও কর্মবাজারে প্রবেশের উপযোগী করে গড়ে তোলা। তবে বহুভাষিক শিক্ষার সুফল পেতে হলে শুধু ভাষা শেখার আহ্বান যথেষ্ট নয়; মানসম্মত শিক্ষক, সহজলভ্য শিক্ষা উপকরণ, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের সহায়তাও প্রয়োজন।
তরুণদের জন্য নেতৃত্বের দরজা খোলা
আনোয়ারের তরুণনীতি আলোচনায় নেতৃত্বের ধারণাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ১১ অক্টোবরের আন্তর্জাতিক তরুণ নেতৃত্ব সম্মেলনে তিনি বলেন, তরুণদের শুধু ভবিষ্যতের নেতা হিসেবে বিবেচনা করার কারণ নেই; তারা বর্তমানেরও নেতা। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমাজের নৈতিক বিবেক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে এবং দুর্নীতি, শোষণ ও কাঠামোগত অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।
এই বক্তব্যে নেতৃত্বকে কেবল রাজনৈতিক পদ, প্রশাসনিক ক্ষমতা কিংবা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। জনপরিসরে যুক্তিনির্ভর আলোচনা, সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ, নীতির সমালোচনা এবং জনস্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকেও নেতৃত্বের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। আনোয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ আইন, ১৯৭১ (AUKU)-এর বিধিনিষেধমূলক ধারাগুলো অপসারণের বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নীতির সমালোচনা করলেই কোনো শিক্ষার্থীকে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত নয়। ১১ থেকে ১৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মালয়েশিয়া ও আরো ৬০টি দেশের মোট ১ হাজার ২৩১ জন শিক্ষার্থী নেতা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ৮১৩ জন মালয়েশীয় এবং ৪১৮ জন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি ছিলেন।
তবে আইনের পরিবর্তন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বাস্তব সুরক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাধীন ছাত্ররাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিবেশ—এগুলো পৃথক বিষয়। ঘোষিত অঙ্গীকার কতটা কার্যকর হবে, তা বোঝার জন্য আইনি সংস্কারের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আচরণ এবং সমালোচনাকারী শিক্ষার্থীদের অধিকার বাস্তবে কীভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
এআইয়ের যুগে দক্ষতা, কিন্তু নৈতিকতার বিনিময়ে নয়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনকে তরুণদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন আনোয়ার। ৩ অক্টোবর ইয়ুথ ইকোনমিক ফোরামের উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি সতর্ক করেন, এআইকে আয়ত্ত করতে না পারলে প্রযুক্তিই মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও বিচারবোধ অক্ষুণ্ন রাখার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
এ বক্তব্যের পেছনে রয়েছে অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, তথ্য বিশ্লেষণ, জেনারেটিভ এআই এবং ডিজিটাল সেবা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ধরন বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনে তরুণদের জন্য যেমন নতুন পেশার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তেমনি প্রচলিত কিছু কাজের চাহিদা কমে যাওয়া, দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্যের ঝুঁকিও রয়েছে। তাই প্রযুক্তি শেখার সুযোগকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে কারিগরি শিক্ষা, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের কাছেও পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
ইয়ুথ ইকোনমিক ফোরামে উপস্থাপিত ছয়টি তরুণ-প্রণীত নীতিপ্রস্তাবে এআইয়ের ব্যবহার সম্প্রসারণ, পেশাগত যোগ্যতা ও স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ, সরকারি সেবা দ্রুততর করতে এআই প্রয়োগ এবং নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরির বিষয় উঠে আসে। এসব প্রস্তাবের লক্ষ্য প্রযুক্তিকে শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতার উপকরণ হিসেবে নয়, উৎপাদনশীলতা ও জনসেবার উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা।
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, অ্যালগরিদমের পক্ষপাত, ভুল তথ্য, কর্মসংস্থানে বৈষম্য এবং মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রক্ষার প্রশ্নও জড়িত। ফলে প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি তথ্য যাচাই, সমালোচনামূলক চিন্তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের শিক্ষা জরুরি।
তরুণদের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব: প্রস্তাব থেকে নীতিতে
তরুণদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু চাকরির সুযোগ তৈরি নয়, নীতিনির্ধারণে তাঁদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইয়ুথ ইকোনমিক ফোরামে পেরদানা ফেলোস অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ছয়টি নীতিপ্রস্তাব সরকারের কাছে তুলে দেওয়া হয়। দেশজুড়ে দুই হাজারের বেশি তরুণের জরিপ এবং ১১২ জন তরুণ নেতার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত আলোচনা থেকে এসব প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে এআই শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত করা, সরকারি সেবায় প্রযুক্তির প্রয়োগ, বিদেশি বিনিয়োগের সঙ্গে স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নকে যুক্ত করা, সবুজ উদ্যোক্তা তৈরি এবং তরুণদের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে সম্পৃক্ত করার জন্য একটি স্থায়ী জাতীয় যুব অর্থনৈতিক কর্মপরিষদ প্রতিষ্ঠা। পাশাপাশি ছয়টি অঞ্চলে তরুণদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে জীবনযাত্রার ব্যয়, আগামী দশকের চাকরির নিরাপত্তা এবং আর্থিক সংকটে সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
এই প্রস্তাবগুলোর গুরুত্ব হলো, তরুণদের সমস্যাকে শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগের অভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং অর্থনৈতিক কাঠামো, দক্ষতার সুযোগ, সরকারি সেবার মান এবং সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করে বিবেচনা করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশি বিনিয়োগ থেকে স্থানীয় তরুণরা কতটা উপকৃত হবেন, তা নির্ভর করে বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, মানসম্মত চাকরি এবং দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়নের ওপর।
একইভাবে সবুজ উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উৎপাদনে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে সহজ শর্তে অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, ব্যবসায়িক পরামর্শ এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। প্রস্তাব গ্রহণের পর সেগুলোর কোনটি বাজেটে স্থান পাচ্ছে, কোনটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাচ্ছে এবং কী ফলাফল অর্জিত হচ্ছে—সেটিই হবে মূল বিবেচ্য।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান: নৈতিকতা রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি
আনোয়ারের তরুণনীতি আলোচনায় নৈতিকতা ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। ইয়ুথ ইকোনমিক ফোরামে তিনি নিজের শৈশবের একটি ঘটনা তুলে ধরেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, আট-নয় বছর বয়সে পেনাংয়ের বুকিত মারতাজামের কাছে একটি খামার থেকে অনুমতি ছাড়া কয়েকটি জয়ফল নেওয়ার পর তাঁর দাদি তাঁকে সেগুলো ফেরত দিতে বাধ্য করেন। অন্যের সম্পদ অনুমতি ছাড়া নেওয়া—পরিমাণ যত সামান্যই হোক—চুরি, এই শিক্ষাই তিনি ঘটনাটি থেকে পেয়েছিলেন বলে জানান।
শৈশবের এই স্মৃতি তুলে ধরে আনোয়ার বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ বা দুর্নীতির ক্ষেত্রে আপস করা উচিত নয়। তিনি তরুণদেরও দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জাতিগত পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা দলীয় আনুগত্যের কারণে তাঁদের রক্ষা না করার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যের মূল কথা, নৈতিকতার মানদণ্ড সবার জন্য সমান হওয়া উচিত; কোনো গোষ্ঠীর পরিচয় দুর্নীতিকে বৈধতা দিতে পারে না।
এখানে ব্যক্তিগত সততা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। একজন নেতার ব্যক্তিগত সততা প্রয়োজনীয় হলেও তা একা দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে পারে না। সরকারি ক্রয়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক অর্থায়ন, প্রশাসনিক নিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও স্বাধীন তদারকি না থাকলে অনিয়মের সুযোগ থেকে যায়। ফলে তরুণদের নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, স্বাধীন তদন্ত এবং আইনের সমান প্রয়োগের দাবিও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
বহুজাতিক সমাজে ঐক্য ও নাগরিকত্বের ধারণা
বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও অঞ্চলের মানুষের সহাবস্থান মালয়েশিয়ার সামাজিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আনোয়ার তরুণদের সংকীর্ণ জাতিগত, ধর্মীয় ও আঞ্চলিক বিভাজন অতিক্রম করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের বৈচিত্র্যকে বিরোধের উৎস না বানিয়ে সম্মিলিত শক্তিতে পরিণত করতে হবে।
এ আহ্বানের তাৎপর্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত। সামাজিক বিভাজন বাড়লে পারস্পরিক আস্থা, বিনিয়োগের পরিবেশ, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিপরীতে, ভিন্ন পরিচয়ের মানুষের সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
তবে ঐক্যের অর্থ মতপার্থক্য মুছে ফেলা নয়। একটি বহুত্ববাদী সমাজে ঐক্য টেকসই হয় তখনই, যখন সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠ উভয়ের অধিকার সুরক্ষিত থাকে, বৈষম্যের অভিযোগের নিরপেক্ষ সমাধান হয় এবং নাগরিকেরা ভয় ছাড়াই নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারেন। তরুণদের নেতৃত্বে সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে হলে তাই পারস্পরিক শ্রদ্ধার পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
তরুণবান্ধব নীতির বাস্তব পরীক্ষা
আনোয়ার ইব্রাহিমের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও তরুণদের প্রস্তাবগুলোতে কয়েকটি পরস্পরসম্পর্কিত অগ্রাধিকার দেখা যায়: শিক্ষার সুযোগ ও শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা পূরণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণে তরুণদের অংশগ্রহণ, দুর্নীতিবিরোধী নৈতিকতা এবং সামাজিক ঐক্য। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত যুব উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
তবে বক্তব্য, প্রস্তাব ও বাস্তবায়িত নীতির মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীদের খাদ্যসহায়তা নিয়ে বাজেটে উদ্যোগের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে; কিন্তু নির্দিষ্ট বরাদ্দ, যোগ্যতার শর্ত, সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও বাস্তবায়নপদ্ধতি সম্পর্কে এখানে আলোচিত প্রতিবেদনগুলো থেকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায় না। একইভাবে তরুণদের অর্থনৈতিক কর্মপরিষদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছে বা কার্যকর হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্যও এসব প্রতিবেদন দেয় না।
অতএব, নীতির সাফল্য যাচাই করতে কয়েকটি বাস্তব প্রশ্ন সামনে রাখা প্রয়োজন: আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমছে কি না; তরুণদের জন্য মানসম্মত ও নিরাপদ কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না; প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না; তরুণদের নীতিপ্রস্তাব বাজেট ও সরকারি সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না; এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান বাস্তব জবাবদিহিতে রূপ নিচ্ছে কি না।
মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে একটি বৃহত্তর নীতিগত শিক্ষা পাওয়া যায়—তরুণদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত করার পাশাপাশি বর্তমানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের অংশীদার করা প্রয়োজন। তবে অংশীদারত্ব কেবল সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ নয়; এর মধ্যে থাকতে হবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নীতিনির্ধারণে প্রতিনিধিত্ব, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ, আর্থিক নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্তের ফলাফল যাচাই করার অধিকার।
আনোয়ারের আহ্বানের মূল তাৎপর্যও এখানেই: আগামীর মালয়েশিয়া গড়ার দায়িত্ব শুধু আগামী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে বর্তমান নেতৃত্ব দায়মুক্ত থাকতে পারে না। বরং বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে তরুণদের যৌথভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সেই পরিবেশ কতটা কার্যকর হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব সুযোগ, ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন এবং ব্যক্তিগত সদিচ্ছার চেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের ওপর।
তথ্যসূত্র: দ্য স্টার, মালয় মেইল, দ্য এজ মালয়েশিয়া ও বারনামা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


