ভারতে নারী বিক্ষোভকারীদের হেনস্থা, আবারো নতুন কর্মসূচির ডাক ককরোচ পার্টির

ভারতে নারী বিক্ষোভকারীদের হেনস্থা, আবারো নতুন কর্মসূচির ডাক ককরোচ পার্টির
রোববার নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হয় দিল্লি পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লি ও মুম্বাইয়ে টানা কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। পুলিশের বাধা, আটক ও নারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে আন্দোলন আরো জোরালো হয়েছে। এরই মধ্যে আগামী ১০ অক্টোবর আবারো দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ ও মিছিলের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং কয়েকটি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন।

বিজ্ঞাপন

২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীর দিন শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ পরবর্তী দুই দিনও অব্যাহত থাকে। বিক্ষোভকারীদের অনেকে চলমান কর্মসূচিকে ‘যন্তর-মন্তর ২.০’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে এবার দিল্লি পুলিশ আগের তুলনায় আরো কঠোর অবস্থান নেয়। বিক্ষোভকারীদের কাউকেই যন্তর-মন্তরে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।

রোববার দিল্লিতে সাধারণ মানুষ, সমাজকর্মী ও ছাত্র সংগঠনগুলোর উদ্যোগে ইন্ডিয়া গেট থেকে যন্তর-মন্তর পর্যন্ত ‘সিটিজেন্স মার্চ’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। এর আগের দিন দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে কয়েকজন নারী সাংবাদিককে হেনস্থার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পর রোববার আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে ওঠে।

এর মধ্যে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কয়েকটি কলেজ ক্যাম্পাসে নারী নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে যন্তর-মন্তরে পুলিশের আচরণ নিয়ে ক্ষোভের বিষয়টি একাকার হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ দুই প্রতিবাদের বিভিন্ন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

ছাত্র সংগঠন আইসার নেত্রী নেহা বোরা অভিযোগ করেন, পুলিশ যে গাড়িতে তাকে নিয়ে যায়, সেখানে কোনো নারী পুলিশ সদস্য ছিলেন না। পরে তাকে যন্তর-মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের নারেলা এলাকায় নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আইসার অভিযোগ, ওই সময় নেহা বোরার কাছে তার মোবাইল ফোনও ছিল না।

আন্দোলন চলাকালে আরো কয়েকজন নেতা দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেন। আম আদমি পার্টির কর্মীরাও বিপুলসংখ্যায় ইন্ডিয়া গেট এলাকায় বিক্ষোভে যোগ দেন। দলের দিল্লি প্রদেশ সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজকেও আটক করে পুলিশ।

পরে এক্সে পোস্ট করা এক ভিডিওতে সৌরভ ভরদ্বাজ অভিযোগ করেন, ইন্ডিয়া গেটে তাকে পুলিশ উল্টো করে ঝুলিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, যাতে ক্যামেরায় তার মুখ ধরা না পড়ে। ভিডিওতে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়।

সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদবও পুলিশের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর-মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় তাদের জোর করে আটক করা হয়েছে। তার ভাষ্য, এটি এক দিনের প্রতীকী প্রতিবাদ নয়; জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

রোববার সন্ধ্যায় ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেসও জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে মিছিল করে। ভোটার তালিকায় কথিত অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করে সংগঠনটি। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তারা যন্তর-মন্তর আবার মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা এবং জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেপ্তারের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচির কথা জানায়।

অন্যদিকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে মুম্বাইয়ে ‘গর্জনা মোর্চা’ আয়োজন করে উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা ও রাজ ঠাকরের মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা (এমএনএস)। কর্মসূচিতে দুই ঠাকরে নেতাই অংশ নেন।

এর আগে ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কেও ককরোচ জনতা পার্টির ডাকে বড় বিক্ষোভ হয়। পুলিশ অনুমতি না দিলেও বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন। ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, সরকার এতটাই অযোগ্য যে দুই মাসের মধ্যে তাদের দ্বিতীয়বার বিক্ষোভে নামতে হচ্ছে। তিনি বলেন, গান্ধী যদি ভারতের আত্মা হন, তবে আম্বেদকর দেশটির মেরুদণ্ড। তার দাবি, ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর ও জওহরলাল নেহরুই ভারতের জনগণকে ভোটাধিকার দিয়েছেন।

মুম্বাইয়ের ওই কর্মসূচিতে অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি এবং সুরকার-গায়ক বিশাল দাদলানিও উপস্থিত ছিলেন। উদ্ধব ঠাকুরের শিবসেনাও এতে সমর্থন জানায়।

এদিকে মুম্বাইয়ের কর্মসূচির পর সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লিতে ফের বড় আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘আমার ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছি, আপনিও গুছিয়ে নিন, দিল্লি রওনা হতে হবে।’

দিল্লিতে যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ার পাশাপাশি দিল্লি মেট্রোও ১০টির বেশি স্টেশন বন্ধ করে দেয়। এরপরও বিপুলসংখ্যক মানুষ যন্তর-মন্তরে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটক করে। নেহা বোরা, প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদব, সৌরভ ভরদ্বাজ ও সঞ্জয় সিংসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হলেও কাউকেই বিক্ষোভস্থলে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।

এদিকে নির্বাচন কমিশন শুক্রবার সকালে এক্সে পোস্ট করে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে বাদ পড়া নামগুলো পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় ভোটার তালিকা যাচাই, বাদ পড়া ভোটারদের শনাক্ত করা এবং তাদের ফর্ম-৬ পূরণ করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, বুথ লেভেল কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই করবেন। তরুণ ভোটারদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং বুথ পর্যায়ে বিশেষ শিবিরও আয়োজন করা হবে।

কেন জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি?

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ছাড়া অপর দুই নির্বাচন কমিশনার গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের জানানো হয়নি। নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং কথিত ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ পদক্ষেপ নিয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী আপত্তি তুলেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ককরোচ জনতা পার্টিও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জোরালো করেছে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক কার্যক্রম নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে এবং কমিশনের প্রতি আস্থা পুনঃস্থাপন করতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ প্রয়োজন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন