লেবানন–ইসরাইল সীমান্তে উত্তেজনা এখন তীব্র। হিজবুল্লাহ একসাথে শতাধিক রকেট নিক্ষেপ করে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। আইডিএফের আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাপের মধ্যে পড়ে। হাইফা, আকরে ও ক্রাইয়ট অঞ্চলে সতর্কবার্তা জারি হয়েছে। নাগরিকরা আতঙ্কিত। যাত্রীবাহী যানবাহন থেমে গেছে। স্কুল, অফিস বন্ধ।
হিজবুল্লাহ শুধু রকেট ছুড়ছে না। ড্রোন, স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, কমান্ডো অপারেশন-সবই একসাথে চলছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় সামরিক ঘাঁটি, ব্যারাক, ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রও লক্ষ্য। গত বুধবার ভোরে গিভা ড্রোন ঘাঁটি, ইফতাহ ব্যারাক এবং তেল আবিবের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। হিজবুল্লাহ টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে নিজেদের এই দাবি প্রকাশ করেছে।
ইসরাইলি গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহর রকেটগুলো ভারী, দ্রুতগামী এবং দীর্ঘ-পাল্লার। হাইফা, তেল আবিব এমনকি দক্ষিণ ইসরাইল পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম। সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে ইসরাইলি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস ‘মেগান ডেভিড অ্যাডম’ জানিয়েছে।
হিজবুল্লাহর কৌশল নতুন। একসাথে রকেট নিক্ষেপ, স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার এবং ড্রোন হামলার সমন্বয়। ইসরাইলের উত্তরের ফ্রন্ট এখন ‘দ্বৈত যুদ্ধ রেখা’। গাজা ফ্রন্টের পাশাপাশি লেবাননে স্থায়ী চাপ বজায় রাখা তাদের সামরিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
ইরানের সহায়তায় হিজবুল্লাহর অস্ত্রভাণ্ডার শক্তিশালী। তাদের হাতে নন-স্টেট আর্টিলারি সবচেয়ে বড়। এক লাখ ৫০ হাজার রকেট, প্রতিদিন ২,৫০০–৩,০০০ রকেট নিক্ষেপের সক্ষমতা। শতাধিক নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র। করনেট ও তুফান সিরিজের এন্টি-ট্যাংক মিসাইল। ক্যামিকাজে ড্রোনসহ ১২–১৫ প্রকার ড্রোন। ‘রাদওয়ান ইউনিট’ নামের স্পেশাল ফোর্স। সীমান্তে দ্রুত প্রবেশের সক্ষমতা রয়েছে।
এদিকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরাইল দুই ফ্রন্টের যুদ্ধ চায় না। কারণ গাজা ও লেবানন একসাথে মোকাবিলা অসম্ভব। তাদের রিজার্ভ সেনা সীমিত। আকাশ প্রতিরক্ষা চাপের মধ্যে। একদিনে ২–৩ হাজার রকেট পড়লে আইরন ডোম ‘স্যাচুরেশন’ হয়ে যাবে, সেটি তারা জানে। দুই ফ্রন্টে যুদ্ধে হাইফা–গ্যালিলি অঞ্চলের শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি ৩০–৪০% ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মার্কিন প্রশাসন হিজবুল্লাহকে সরাসরি যুদ্ধে না টানার পরামর্শ দিচ্ছে।
এদিকে লেবাননে মানবিক প্রভাব ভয়ংকর হয়ে উঠছে। লেবাননের দক্ষিণ ও বৈরুতের পার্শ্ববর্তী এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বোমায়। ইসরাইলের বিমান হামলায় অন্তত ৪০০ জন নিহত হয়েছে। বহু লোক আশ্রয়হীন। শিশু, মহিলা ও বৃদ্ধরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরছে। সংস্থা ও মানবিক সংগঠনও সীমান্তে কাজ করছে। হিজবুল্লাহর হামলার চিত্রও ভয়াবহ। রকেট উড়ে যাচ্ছে ইজরায়েলে। ড্রোন আকাশে। স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হচ্ছে। আইরন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যস্ত। নাগরিকদের আতঙ্ক। ইসরাইলের শহরও প্রায় খালি।
ইসরাইলি সেনারা উত্তরে অতিরিক্ত মোতায়েন রয়েছে। রাডওয়ান ইউনিট লক্ষ্যবস্তু সীমান্তে। সীমান্তের গভীর ‘বাফার জোন’ তৈরি করছে। হামলা শুরু হলে দ্রুত প্রতিরোধ। স্নাইপার ইউনিট, আর্টিলারি ‘ট্রেড-ফায়ার’, কমান্ডো পেট্রল—সবকিছু একসাথে প্রস্তুত আছে তারা।
হিজবুল্লাহর রকেট হামলা শুধু সংখ্যা নয়। মানে, তা কৌশলগত। সামরিক স্থাপনা, শিল্প এলাকা, গ্যাস টার্মিনাল—সবই তাদের লক্ষ্য। স্থল অনুপ্রবেশও ইজরায়েলের সবচেয়ে বড় হুমকি। হিজবুল্লাহ সীমান্তের পাহাড়ি ভূখণ্ড ব্যবহার করছে। তাদের আবার টানেল নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। আঘাতের ধরন বেশি নির্ভুল।
গত ৫ মার্চও হিজবুল্লাহ গ্যালিলি অঞ্চলের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। গ্রেনেড, স্বল্পদৈর্ঘ্য রকেট ব্যবহার। এবার পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। রকেট, ড্রোন, স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র—সব একসাথে।
ইসরাইলি গোয়েন্দারা স্বীকার করেছেন, হিজবুল্লাহর অস্ত্রভাণ্ডার মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় নন-স্টেট আর্টিলারি। ইরান সরবরাহ করছে সিরিয়ার মধ্য দিয়ে। হামাসের মতো নয়। ভারী, দ্রুতগামী, দীর্ঘ-পাল্লার রকেট। স্থল অনুপ্রবেশের প্রশিক্ষিত কমান্ডো আছে তাদের। তাই দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ হলে ইসরাইলের বড় সমস্যা। গাজা ফ্রন্টে সেনা মোতায়েন থাকলে উত্তরে আক্রমণ অসম্ভব। আকাশ প্রতিরক্ষা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে। শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত। মার্কিন প্রশাসনও তাই সতর্ক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

