হরমুজে প্রতি রাতে অভিযান, বাড়তি চাপে মার্কিন কর্মীরা

হরমুজে প্রতি রাতে অভিযান, বাড়তি চাপে মার্কিন কর্মীরা
ছবি: দ্য জেরুজালেম পোস্ট

ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ কার্যকর এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে থাকা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালিতে প্রতি রাতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে মার্কিন যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরির ক্রু এবং রক্ষণাবেক্ষণকর্মীদের ওপর বাড়ছে কাজের চাপ। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত আগস্ট থেকে ওই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের পাইলট ও বিমানকর্মীরা জাহাজটির দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং হরমুজ প্রণালিতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা অভিযানের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমটির সঙ্গে কথা বলেছেন।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন সামরিক সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ওপরের আকাশসীমা মাত্র প্রায় ২০ মাইল প্রশস্ত। অথচ সেখানে বিভিন্ন ধরনের আকাশযান ও উড়ন্ত বস্তু চলাচল করায় পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। ফলে ইরানের উপকূল থেকে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো অস্ত্র নিক্ষেপ করা হলে তা শনাক্ত করে প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য যুদ্ধবিমানের পাইলটদের হাতে সময় থাকে খুবই কম।

বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তায় মার্কিন বাহিনী

মার্কিন নৌবাহিনীর ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল জেফরি হিমস ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর আসা হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন বাহিনী নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করছে।

তিনি বলেন, ‘ওই জাহাজগুলোর দিকে কোনো হুমকি এলে, তাকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হোক কিংবা ড্রোন, মার্কিন যুদ্ধবিমান দ্রুত সেখানে গিয়ে তা প্রতিহত ও ধ্বংস করবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দাবি অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে উপসাগরীয় অংশীদার দেশগুলো গ্রীষ্মকাল থেকে এ পর্যন্ত ১৫০ কোটি ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে পেরেছে। একই সময়ে ছয় মাসে ৩ হাজারের বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ছাড়াই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় সেন্টকমের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানান, অবরোধ আরোপের পর থেকে ইরান কোনো তেল রপ্তানি করতে পারেনি।

রাতভর অভিযানে বাড়ছে সামরিক সরঞ্জাম ও কর্মীদের ওপর চাপ

অভিযানগুলোকে সফল বলে দাবি করা হলেও ঘন ঘন অভিযান পরিচালনার কারণে যুদ্ধবিমান, বিমানকর্মী এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে অভিযান সম্পর্কে অবগত মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত ও দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান পরিচালনার ফলে যুদ্ধবিমানগুলোর যন্ত্রাংশে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্রুদের ওপরও শারীরিক ও কর্মগত চাপ তৈরি হচ্ছে।

মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল বলেছেন, এ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নৌবাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। ভারত মহাসাগরের দ্বীপাঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়ায় জাহাজ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, চলমান সংঘাত থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর জন্য আরও বেশি বন্দরে যাত্রাবিরতির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর আগে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নৌসদস্যরা সমুদ্রে টানা ২৮৬ দিন অবস্থান করে রেকর্ড গড়েছেন।

বিমানবাহী রণতরিটির রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা এনসাইন অ্যাডি শেফার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, যুদ্ধবিমান যত বেশি উড্ডয়ন করে, সেগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ও যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকিও তত বাড়ে। ফলে নিয়মিত ও ঘন ঘন রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিতে মাসিক ব্যয়

মার্কিন সামরিক নেতারা বলছেন, প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় ধরে অবরোধ কার্যকর রাখা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে কিছু মার্কিন কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের ব্যয়বহুল ও জনবলনির্ভর অভিযান বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে সম্ভাব্য নতুন কোনো সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সেনা এবং ২০টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। এ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং অভিযান পরিচালনার জন্য গোলাবারুদ, জ্বালানি, সরবরাহ ও অন্যান্য খাতে প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হচ্ছে আনুমানিক ২০০ কোটি থেকে ৩০০ কোটি ডলার।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ কার্যকর ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এ অভিযানের আর্থিক ব্যয়, সামরিক সরঞ্জামের ওপর চাপ এবং সেনাসদস্যদের কর্মপরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট

আরএ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন