সিঙ্গাপুরে জন্মহার নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। সন্তান জন্মে উৎসাহ দিতে নানা উদ্যোগের পর এবার অবিবাহিতদের জুটি মেলানোর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। সরকারি কর্মীদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘ফার্স্টডেট’ নামে একটি ডেটিং প্ল্যাটফর্ম। এতে ব্যবহার করা হচ্ছে নোবেল পুরস্কারজয়ী অ্যালগরিদম।
৩০ বছর বয়সি সরকারি কর্মকর্তা নূর আয়েশা গত কয়েক বছর ধরে জীবনসঙ্গী খুঁজছেন। কিন্তু কাজ বা শখের সূত্রে পুরুষদের সঙ্গে তার খুব একটা পরিচয় হচ্ছে না। টিন্ডার ও বাম্বলের মতো ডেটিং অ্যাপও তার কাছে ‘ভয়াবহ’ মনে হয়েছে। সম্ভাব্য সঙ্গীদের কেউ প্রোফাইলে তেমন তথ্য দেন না, আবার কেউ লিখিত কথোপকথন চালিয়ে নিতে পারেন না।
নূর সন্তান নিতে আগ্রহী। তবে সিঙ্গাপুরে সন্তান বড় করার খরচ নিয়েও তার উদ্বেগ আছে। দেশটিতে আবাসন ও শিশুর দেখাশোনার ব্যয় বেশি। আর সন্তান পালনের দায়িত্ব সাধারণত নারীদের ওপরই বেশি পড়ে। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি কিছুটা হতাশ।
এই অবস্থায় সিঙ্গাপুর সরকারের প্রযুক্তিবিষয়ক সংস্থা গভটেক সম্প্রতি ‘ফার্স্টডেট’ চালু করলে কৌতূহল থেকেই নিবন্ধন করেন নূর। ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সি অবিবাহিত সরকারি কর্মীদের মধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে প্ল্যাটফর্মটি চালু করা হয়েছে।
অংশগ্রহণকারীরা জাতীয় ডিজিটাল পরিচয় ব্যবহার করে এতে প্রবেশ করেন। এরপর তাদের আগ্রহ, অভ্যাস ও মূল্যবোধ নিয়ে একটি প্রশ্নপত্র পূরণ করতে হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে একবারে একজন সম্ভাব্য সঙ্গীর সঙ্গে তাদের মিলিয়ে দেওয়া হয়। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে নিবন্ধনের সময়সীমা সোমবার শেষ হয়েছে।
গভটেক স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, সরকারি কর্মীদের বাইরে এই সেবা সম্প্রসারণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
জন্মহার নিয়ে উদ্বেগ
সিঙ্গাপুর সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে বড় কারণ দেশটির দ্রুত কমতে থাকা জন্মহার। ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই নগররাষ্ট্রে ৩০ হাজারেরও কম শিশু জন্মেছে। এতে দেশটির প্রজনন হার নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ০ দশমিক ৮৭-এ।
গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং পরিবারকে সহায়তায় নতুন কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে জন্মের পর থেকে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতিটি শিশুর জন্য প্রায় ৭০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার বা ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক সুবিধাও রয়েছে।
প্রায় ৬০ লাখ নাগরিকের এই দেশটিতে জনসংখ্যা কমে যাওয়া ও দ্রুত বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি বড় উদ্বেগের। ফেব্রুয়ারিতে উপপ্রধানমন্ত্রী গ্যান কিম ইয়ং সতর্ক করে বলেন, কোনো পদক্ষেপ না নিলে ২০৪০-এর দশকের শুরুর দিকে দেশটির নাগরিক জনসংখ্যা কমতে শুরু করতে পারে। এতে বয়স্কদের দেখাশোনার জন্য কর্মীর সংখ্যাও কমে যাবে।
শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে সিঙ্গাপুর ইতিমধ্যে অভিবাসনের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। আগামী পাঁচ বছরে প্রতিবছর ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার নতুন নাগরিক নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে ৬২ লাখ মানুষের ছোট দেশটিতে এই অভিবাসন রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়।
অন্যদিকে, সরকারি কর্মকর্তারা সন্তান নেওয়ার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করলেও অনেক সিঙ্গাপুরবাসী সন্তানহীন জীবন বেছে নিয়েছেন। দুই আয়ের পরিবারে কম খরচে জীবনযাপন কিংবা পোষা প্রাণীর প্রতি মনোযোগ দেওয়াকে তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ভালোবাসায় সরকারের হস্তক্ষেপ নতুন নয়
সিঙ্গাপুর সরকার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে এবারই প্রথম নয়। ১৯৮৩ সালে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ এক বক্তৃতায় বলেন, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত নারীরা দেরিতে বিয়ে করছেন এবং কম সন্তান নিচ্ছেন। ওই বক্তব্যের পর দেশটিতে শুরু হয় তথাকথিত ‘গ্রেট ম্যারেজ ডিবেট’।
পরের বছর লির সরকার ‘গ্র্যাজুয়েট মাদার্স স্কিম’ চালু করে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মায়েদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো।
একই সময়ে সরকার ‘সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ইউনিট’ বা এসডিইউ গঠন করে। এর কাজ ছিল উচ্চশিক্ষিত অবিবাহিতদের পরিচয়ের সুযোগ তৈরি করা। সমালোচকেরা সংস্থাটিকে অভিজাতদের জন্য বলে আখ্যা দেন। পরে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করা অবিবাহিতদের জন্যও আলাদা একটি সংস্থা গঠন করা হয়।
সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের গবেষক তান এরন সার বলেন, ভালোবাসা ও বিয়ের মতো ব্যক্তিগত বিষয়েও সিঙ্গাপুর সরকারের হস্তক্ষেপের প্রবণতা রয়েছে।
তার মতে, অতীতে সরকারের ম্যাচমেকিং উদ্যোগগুলো খুব একটা কার্যকর বা ব্যয়সাশ্রয়ী ছিল না। তবে বর্তমান প্রজন্মের কর্মকর্তারাও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।
নোবেলজয়ী অ্যালগরিদমে জুটি
‘ফার্স্টডেট’-এর ভিত্তি হলো গেইল-শ্যাপলি অ্যালগরিদম। গণিতবিদ ডেভিড গেইল ও লয়েড শ্যাপলি ১৯৬২ সালে এটি তৈরি করেন। দুই পক্ষের পছন্দের ক্রম বিবেচনা করে এই অ্যালগরিদম জুটি নির্ধারণ করে।
শ্যাপলি এই কাজের জন্য ২০১২ সালে অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার পান। অ্যালগরিদমটির বিভিন্ন সংস্করণ স্কুলে ভর্তি ও চিকিৎসকদের আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে নিয়োগের মতো ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়।
সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির মনোবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক জিন লিউ বলেন, প্রচলিত ডেটিং অ্যাপগুলোর তুলনায় ‘ফার্স্টডেট’ একেবারেই ভিন্ন পদ্ধতিতে কাজ করে। সেখানে অসংখ্য প্রোফাইল দেখার বদলে একবারে একজন সম্ভাব্য সঙ্গী দেখানো হয়।
তবে এই পদ্ধতি মানুষকে সত্যিই ভালো সঙ্গী খুঁজে দেবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। লিউ বলেন, প্রশ্নপত্র দিয়ে দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠবে কি না, তা পুরোপুরি অনুমান করা কঠিন। আবার প্ল্যাটফর্মে কতজন অংশ নিচ্ছেন, তার ওপরও সাফল্য নির্ভর করবে। অংশগ্রহণকারী খুব কম হলে পুরো প্রক্রিয়াই ব্যর্থ হতে পারে।
তার মতে, এই উদ্যোগের বড় মূল্য হতে পারে ডেটিং–সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের সুযোগ। কারণ বেসরকারি ডেটিং অ্যাপগুলো নিজেদের অ্যালগরিদমকে বাণিজ্যিকভাবে সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে বিবেচনা করে।
সিঙ্গাপুরই অবশ্য প্রথম নয়। ২০২৪ সালে টোকিওর মহানগর সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটিং অ্যাপ ‘টোকিও এনমুসুবি’ চালু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল সরকারও ‘সিউলটিং’ নামে বিভিন্ন স্থানে অবিবাহিতদের জন্য পরিকল্পিত ব্লাইন্ড ডেটের আয়োজন করছে।
উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্নও আছে
সরকারের এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে সিঙ্গাপুরবাসীর প্রতিক্রিয়া মিশ্র। কেউ এটিকে সরকারি অর্থের অপচয় বলছেন। কেউ আবার ঠাট্টা করে বলছেন, এবার হয়তো ‘রাষ্ট্র নির্ধারিত জীবনসঙ্গী’ মিলবে কিংবা জীবনসঙ্গী খোঁজাও চাকরির লক্ষ্যমাত্রার অংশ হয়ে যাবে।
শিক্ষা খাতে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা জেমি এই প্ল্যাটফর্মে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন। তবে তার যোগ দেওয়ার ইচ্ছা নেই। তার ভাষায়, উদ্যোগটি কিছুটা ‘বিব্রতকর’ এবং মনে হচ্ছে কেউ বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত চেষ্টা করছে।
জেমি বলেন, মানুষের সামাজিক দক্ষতা কমে গেছে। কর্মস্থল থেকে ফেরার পর তিনি এতটাই ক্লান্ত থাকেন যে বাড়ি গিয়ে শুয়ে থাকতে চান। বিভিন্ন কমিউনিটি গ্রুপের মাধ্যমে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত তাঁর মূল্যবোধের সঙ্গে মেলে বা সম্পর্কের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত—এমন কাউকে পাননি।
প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যবহার নিয়েও তার প্রশ্ন আছে। কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সেই তথ্য দিয়ে কী করা হবে—তা নিয়েও উদ্বিগ্ন তিনি।
‘ফার্স্টডেট’-এর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারীর প্রোফাইল শুধু তার সম্ভাব্য সঙ্গী দেখতে পারবেন। দুজন সম্মত হলেই যোগাযোগের তথ্য দেওয়া হবে। আইনগতভাবে প্রয়োজন বা অনুমোদিত না হলে তথ্য বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার বা তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হবে না।
সিঙ্গাপুরের পিএইচডি গবেষক ও সাবেক স্ট্রেইটস টাইমস সাংবাদিক তেও কাই শিয়াং মনে করেন, পছন্দের তালিকায় ভালোবাসাকে নামিয়ে আনা সম্পর্ককে অতিরিক্ত হিসাব-নিকাশের বিষয়ে পরিণত করতে পারে। তাঁর মতে, এতে জীবনসঙ্গী যেন একদিকে আর্থিক অংশীদার, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত সন্তানের সহ-অভিভাবক হয়ে ওঠেন।
সিঙ্গাপুরের সরকারি আবাসন ব্যবস্থাও এই মানসিকতাকে আরও জোরালো করছে বলে মনে করেন তেও। ভর্তুকি পেতে আগ্রহী দম্পতিদের জন্য বিয়ের আগেই আবাসনের আবেদন করা একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ৩৬ বছর বা তার বেশি বয়সীদের এই উদ্যোগের বাইরে রাখা হলো কেন।
তেও সরকারের এই পরীক্ষাকে স্বাগত জানালেও তার মতে, সিঙ্গাপুরের উচিত মানুষের স্বাভাবিকভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ও রাতের বিনোদনের পরিসর বাড়ানো।
তার মতে, ডেটিংয়ের বড় বাধা হলো খরচ—রাতে যাতায়াতের ব্যয় থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া পর্যন্ত। এ কারণে অনেক অবিবাহিত মানুষ ৩০-এর দশকেও বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেন।
সিঙ্গাপুরে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ সরকারি আবাসনে থাকেন। তবে অবিবাহিত ব্যক্তিরা একা সরকারি আবাসন কিনতে পারেন না; ৩৫ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত এ সুযোগ নেই।
তেওর ভাষায়, মানুষকে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়তে কী সাহায্য করে, তা আসলে পুরোপুরি জানা নেই। ভালোবাসা খুবই জটিল ও ব্যক্তিনির্ভর বিষয়। তাই সমাজজুড়ে সেটিকে কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে পরিচালনা করা কঠিন।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

