বিশ্বজুড়ে পুরুষের চেয়ে শরীরে বেশি ব্যথা অনুভব করেন নারীরা

বিশ্বজুড়ে পুরুষের চেয়ে শরীরে বেশি ব্যথা অনুভব করেন নারীরা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৬১ লাখের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, শরীরের প্রায় সব প্রধান অংশেই পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি ব্যথা অনুভব করেন। ১১৮টি দেশের ৬১ লাখ ২৫ হাজার ৪৫৯ জনের তথ্য নিয়ে পরিচালিত এই বৃহৎ গবেষণাটি সম্প্রতি ‘নেচার মেডিসিন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণায় ১৯৯০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে ৫ বছর বয়সী শিশু থেকে শুরু করে ১০০ বছরের বেশি বয়সী মানুষও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। গবেষকরা শরীরের ১১টি অংশে ব্যথার উপস্থিতি পরিমাপ করেন। এর মধ্যে ছিল মাথা, মুখ, ঘাড় বা কাঁধ, পা বা গোড়ালি, হাত বা কবজি, কনুই, বুক, পিঠ, পেট, কোমর ও হাঁটু।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় দেখা যায়, শরীরের সব কয়টি অংশেই নারীদের ব্যথার হার পুরুষদের তুলনায় বেশি। সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা গেছে মুখের ব্যথা, মাথাব্যথা এবং পেট বা উদরের ব্যথায়। মুখের ব্যথার ক্ষেত্রে নারীদের ব্যথার হার পুরুষদের তুলনায় প্রায় ৮৩ শতাংশ বেশি, মাথাব্যথায় প্রায় ৭৪ শতাংশ এবং পেট বা উদরের ব্যথায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি ছিল।

শুধু ব্যথার উপস্থিতি নয়, তীব্র ব্যথা এবং শরীরের একাধিক অংশে একসঙ্গে ব্যথার ক্ষেত্রেও নারীদের হার বেশি পাওয়া গেছে। গবেষণায় ‘যেকোনো শারীরিক ব্যথা’র ক্ষেত্রে নারীদের হার পুরুষদের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি ছিল। উচ্চমাত্রার ব্যথার ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও বড়—নারীদের হার ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ বেশি।

গবেষকরা আরো দেখেছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যথার প্রবণতা সাধারণভাবে বাড়লেও সব ধরনের ব্যথার ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা যায় না। শরীরের যেকোনো অংশে ব্যথার হার বয়সের সঙ্গে ক্রমাগত বাড়তে থাকে। তবে তীব্র ব্যথা মধ্য ও পরবর্তী প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরে কিছুটা কমে। উচ্চমাত্রার ব্যথা প্রায় ৫০ বছর বয়সে এবং শরীরজুড়ে ব্যাপক ব্যথা প্রায় ৭০ বছর বয়সে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রবণতা দেখা গেছে।

ব্যথা বৃদ্ধির সবচেয়ে দ্রুত পর্যায়টি অনেক ক্ষেত্রে ৫৫ বছর বয়সের আগেই দেখা যায়। তবে শরীরের বিভিন্ন অংশের ব্যথার ধরন আলাদা। যেমন মাথাব্যথা ও পেটের ব্যথা তুলনামূলক কম বয়সেই সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, অন্যদিকে পিঠ, কোমর ও হাঁটুর ব্যথা বয়স বাড়ার সঙ্গে আরও দীর্ঘ সময় ধরে বাড়তে থাকে।

গবেষণায় দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গেও ব্যথার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। মানব উন্নয়ন সূচক বা এইচডিআই কম এমন দেশ ও অঞ্চলে বিশেষ করে ৪০ বছর বয়সের পর শরীরের যেকোনো অংশের ব্যথা, জয়েন্টের ব্যথা এবং পিঠের ব্যথা তুলনামূলক দ্রুত বাড়তে দেখা গেছে। ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে নিম্ন মানব উন্নয়ন সূচকের দেশগুলোতে যেকোনো শারীরিক ব্যথার হার উচ্চ এইচডিআই অঞ্চলের তুলনায় প্রায় ৩১ শতাংশ পয়েন্ট বেশি ছিল। নিম্ন পিঠের ব্যথার ক্ষেত্রেও ব্যবধান ছিল উল্লেখযোগ্য।

ধূমপান, স্থূলতা ও নিম্ন আয়সহ কিছু পরিচিত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ বিশ্বব্যাপী ব্যথার বোঝার একটি অংশ ব্যাখ্যা করতে পারে। বিশ্বব্যাপী ব্যথার বোঝার প্রায় ১৮ শতাংশের সঙ্গে এসব কারণের সম্পর্ক রয়েছে। তবে কম মানব উন্নয়ন সূচকের দেশগুলোতে অতিরিক্ত ব্যথার বড় অংশের কারণ এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের ব্যথাকে অবমূল্যায়ন না করে চিকিৎসা ও গবেষণায় নারী-পুরুষের পার্থ্যক্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ব্যথা ব্যবস্থাপনায় নারী ও পুরুষের জন্য একই ধরনের পদ্ধতি সব ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নাও হতে পারে। ফলে রোগীর লিঙ্গ, বয়স, অঞ্চল ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা পরিকল্পনা করার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। ব্যথা প্রতিরোধের উদ্যোগও শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। কারণ ব্যথার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে ৫৫ বছর বয়সের আগেই দ্রুত বাড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে ব্যথা প্রতিরোধ ও চিকিৎসার কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

গবেষণাটি বড় পরিসরের হলেও এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অধিকাংশ তথ্য একই সময়ে মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে একই মানুষকে দীর্ঘ সময় অনুসরণ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে তার ব্যথার পরিবর্তন সরাসরি পরিমাপ করা হয়নি। বরং বিভিন্ন বয়সের মানুষের তথ্য তুলনা করে বয়সভিত্তিক প্রবণতা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবু ১১৮ দেশের ৬১ লাখের বেশি মানুষের তথ্যের এই বিশ্লেষণ বিশ্বব্যাপী ব্যথার ধরন ও নারী-পুরুষের ব্যবধান বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য দিয়েছে।

তথ্যসূত্র: মেডিকেল এক্সপ্রেস, দ্য গার্ডিয়ান ও ন্যাচার

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...