শান্তিতে নোবেল পেলেন মানবাধিকার কর্মী নাভি পিল্লাই। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তাকে মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার দিয়েছে নরওয়ের নোবেল কমিটি। দক্ষিণ আফ্রিকার এই মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারক ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার।
বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ-পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ২০১৩ সালে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া ও মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে দেওয়া তার বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল—একাত্তরের নৃশংসতার বিচার ও দায়মুক্তির অবসান যেমন জরুরি, তেমনি সেই বিচার হতে হবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড, ন্যায়বিচার ও অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ গুরুতর অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়। বিচারপ্রক্রিয়াটি বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল।
২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের বিবৃতিতে নাভি পিল্লাই বলেন, ১৯৭১ সালের ব্যাপক নৃশংসতার দায়মুক্তি মোকাবিলা এবং দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকা ভুক্তভোগীদের প্রতিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বৃহত্তর অঞ্চলে দায়মুক্তির বিরুদ্ধে লড়াইকে শক্তিশালী করতে হলে বিচারপ্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ মান বজায় রাখা জরুরি।
পিল্লাইয়ের উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মৃত্যুদণ্ড। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সরকারকে ওই ট্রাইব্যুনালের মামলাগুলোতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার আহ্বান জানান। পিল্লাইয়ের বক্তব্যে ছিল—বিচারের ন্যায্যতা নিয়ে উদ্বেগ এবং মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নীতিগত অবস্থান।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মামলায় গণবিচার নিয়ে কঠোর সমালোচনা
পিলখানায় ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর নাভি পিল্লাই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর তার বিবৃতিতে বলা হয়, গণবিচার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে ছিল।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে ৭৪ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে পিল্লাই বলেন, শত শত ব্যক্তিকে একসঙ্গে বিচার করা, হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এবং মৌলিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণ না করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া—এসবের মাধ্যমে প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার একটি বিশেষ দায়রা আদালত এই মামলায় ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। ২৭৭ জনকে খালাস দেওয়া হয়। অর্থাৎ, একক রায়ে বিপুলসংখ্যক অভিযুক্তের বিচার হওয়ায় প্রতিটি আসামির ব্যক্তিগত দায়, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে।
পিল্লাইয়ের বিবৃতিতে বিশেষভাবে উঠে আসে যে, মামলাটিতে মোট ৮৪৭ জন সন্দেহভাজনের বিচারপ্রক্রিয়ায় পদ্ধতিগত অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তার মতে, অভিযুক্তদের আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পর্যাপ্ত ও সময়মতো নিশ্চিত করা হয়নি। এটি কেবল আদালতের কার্যক্রমের গতি বা মামলার আকার নিয়ে আপত্তি ছিল না; বরং প্রত্যেক অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ যথাযথভাবে যাচাই, কার্যকর আইনি সহায়তা এবং ন্যায্য আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত হয়েছিল কি না—সেই প্রশ্ন ছিল।
নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ
পিল্লাইয়ের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুতর অংশ ছিল নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ। তার বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বিদ্রোহে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক কয়েকজনের নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। আটক ব্যক্তিদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগও ছিল। পাশাপাশি, শত শত আসামিকে নিয়ে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়ায় নির্যাতনের মাধ্যমে পাওয়া প্রমাণ আদালতে গ্রহণ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগের স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেন পিল্লাই। তিনি তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে আনার এবং নির্যাতন বা অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের অধীনে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা হয়।
নির্যাতনের মাধ্যমে সংগৃহীত প্রমাণ আদালতে ব্যবহার না করার বিষয়টিও তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। কারণ, নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি বা সাক্ষ্য নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্ন তৈরি করে এবং অভিযুক্তের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে। এ ধরনের প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে দণ্ড দেওয়া হলে বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
প্রত্যেক আসামির দণ্ড পৃথকভাবে পর্যালোচনার দাবি
পিল্লাইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল, প্রত্যেক অভিযুক্তের দোষী সাব্যস্ত হওয়া ও দণ্ডের বিষয়টি পৃথকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। তার বক্তব্য ছিল, শত শত ব্যক্তিকে একসঙ্গে বিচার করার পরিবর্তে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রমাণ এবং দায়ের প্রকৃতি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। নির্যাতনের মাধ্যমে পাওয়া কোনো প্রমাণ আদালতে গ্রহণ করা উচিত নয়।
পিল্লাই বাংলাদেশের সরকারকে মনে করিয়ে দেন যে, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন হলেও তা করতে হবে বাংলাদেশের আইন এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা অনুসারে। তিনি বিশেষভাবে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি—ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর)—এর ন্যায্য বিচারের মানদণ্ডের কথা উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ ২০০০ সালে এই চুক্তি অনুসমর্থন করেছিল।
আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের দায়বদ্ধতা
নাভি পিল্লাইয়ের বক্তব্যের আইনি ভিত্তি বুঝতে হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক চুক্তিগত দায়বদ্ধতার বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির ১৪ অনুচ্ছেদে ন্যায্য ও প্রকাশ্য বিচার, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। একই চুক্তির ৭ অনুচ্ছেদে নির্যাতন ও নিষ্ঠুর, অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী নির্যাতনের অভিযোগ তদন্ত এবং নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা বক্তব্যকে সাধারণভাবে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার না করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম ছাড়া। পিল্লাই তার বিবৃতিতে এসব আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার আলোকে বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনার শাসনামল মূল্যায়নে এই বক্তব্যের তাৎপর্য
নাভি পিল্লাইয়ের ২০১৩ সালের বিবৃতি শেখ হাসিনার সরকারের আমলে বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিল। এতে দুটি পৃথক বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল—১৯৭১ সালের অপরাধের বিচারে ন্যায্যতার মান এবং ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামির বিচার, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর অভিযোগ।
এই বক্তব্য থেকে অন্তত তিনটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় পাওয়া যায়।
প্রথমত, গুরুতর অপরাধের বিচার করার রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতাকে বাতিল করে না। একাত্তরের অপরাধের বিচার ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে; কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও অপরাধ দমনের স্বার্থে পরিচালিত বিচারেও অভিযুক্তের মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে হয়। পিলখানার হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা স্বীকার করেও নির্যাতন, অপর্যাপ্ত আইনি সহায়তা এবং গণবিচারের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন পিল্লাই। তার অবস্থান ছিল—অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, তবে তা আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদ্ধতিতে।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ কোনো সরকারের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় নয়। পিল্লাইয়ের এই নির্দিষ্ট বিবৃতি থেকে শেখ হাসিনার শাসনামলে বিচারপ্রক্রিয়া, মৃত্যুদণ্ড, হেফাজতে নির্যাতন ও ন্যায়বিচারের অধিকার নিয়ে তার উদ্বেগ তৎকালীন সরকারের মানবাধিকার-সংক্রান্ত রেকর্ড মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর নাভি পিল্লাইয়ের বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, ন্যায়বিচার শুধু অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয় নয়; বিচার কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, অভিযুক্তের অধিকার রক্ষা করা হচ্ছে কি না এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে কি না—এসবও ন্যায়বিচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


