ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘দিমাগি নকশাল’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। ‘দিমাগি নকশাল’ নামে একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট খোলার এক দিনের মধ্যেই সেটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। রাতারাতি অ্যাকাউন্টটির অনুসারী সংখ্যা ১ লাখ ৮১ হাজার ছাড়িয়ে যায়। সোমবার বিকেলের মধ্যে তা ২ লাখের বেশি হয়ে যায়।
অ্যাকাউন্টটি নিজেকে একটি অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরেছে। এর পাশাপাশি একই নামে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্টও তৈরি হয়েছে। ‘ককরোচ জনতা পার্টি-এর পর এটিকে মোদির মন্তব্যের পাল্টা ডিজিটাল রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অ্যাকাউন্টটির প্রথম দিকের একটি পোস্টে সদস্য হওয়ার শর্ত প্রকাশ করা হয়। সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে বলা হয়— ‘আপনি আমাদের দলে তখনই যোগ দিতে পারবেন, যদি আপনি আপনার নিজের নেতাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন।’
সোমবার কিছু সময়ের জন্য ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি অ্যাক্সেস করা যাচ্ছিল না । পরে এর পরিচালনাকারীরা এক্সে দাবি করেন, অ্যাকাউন্টটি ‘সাইবার হামলার’ মুখে পড়েছে। এ সময় অনেক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্টটির পোস্ট শেয়ার করে অন্যদের দ্রুত অনুসরণ করার আহ্বান জানান।
তবে অ্যাকাউন্টটি কারা পরিচালনা করছেন, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ইনস্টাগ্রাম বায়োতে বলা হয়েছে যে এর প্রতিষ্ঠাতা একজন ‘দিমাগি ইন্ডিয়ান’।
দলটির স্লোগান হলো: ‘আমরা ভাবি। আমরা গবেষণা করি। আমরা প্রতিরোধ করি।’
দলটির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের পোস্টগুলো অনুযায়ী, তারা ভগত সিংয়ের আদর্শ অনুসরণ করছে বলে দাবি করে। একটি পোস্টে দলটি ক্যাপশনে লিখেছে, ‘আমরা ভগত সিংয়ের অনুসারী… যদি তারা আমাদের অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করার বা দেশদ্রোহী তকমা লাগানোর চেষ্টা করে, তবে জেনে রাখবেন — তারা ভগত সিংকে অসম্মান করছে।’
দিমাগি নকশাল’-এর সংজ্ঞা হিসেবে অ্যাকাউন্টটি একটি ক্যাপশনে উদ্ধৃত করে, “এমন একটি মন যা দমনমূলক শাসনের পদ্ধতিগত ধরন শনাক্ত করতে পারে।”
মোদির মন্তব্য ঘিরেই বিতর্ক
স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘দিমাগি নকশালিজম’ নিয়ে মন্তব্য করার পর থেকেই ভারতে এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেওয়া ভাষণে মোদি বলেন, সরকার সশস্ত্র মাওবাদী বিদ্রোহ অনেকাংশে দমন করেছে এবং একসময় নকশাল সহিংসতায় আক্রান্ত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার করেছে।
তবে তার দাবি, নকশালপন্থী হুমকি পুরোপুরি শেষ হয়নি; বরং এর ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। মোদি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে মাওবাদী মানসিকতায় প্রভাবিত ব্যক্তিরা সরকারি কমিটিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকে নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলেছেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর মন্তব্যে কংগ্রেস নেতা চিদাম্বরমের প্রতিক্রিয়া
তার এ মন্তব্যের পর কংগ্রেস নেতা ও ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি. চিদাম্বরম পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমি একজন দিমাগি নকশাল হতে গর্বিত।’
এ নিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপির পক্ষ থেকেও সমালোচনা আসে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু দাবি করেন, মোদি বিরোধী নেতাদের লক্ষ্য করে এ শব্দ ব্যবহার করেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘দিমাগি নকশাল’ বলতে মাওবাদী মতাদর্শ সমর্থনকারী, সংবিধান প্রত্যাখ্যানকারী, বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থনকারী বা দেশের অখণ্ডতার বিরুদ্ধে অবস্থানকারীদের বোঝানো হয়েছে।
বিজেপি সাংসদ রবি শঙ্কর প্রসাদও চিদাম্বরমের মন্তব্যকে ‘সম্পূর্ণ দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তবে মোদির ব্যবহৃত নেতিবাচক রাজনৈতিক শব্দই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা ব্যঙ্গ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। এর আগে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক ডিজিটাল উদ্যোগও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণে ব্যবহৃত শব্দ কীভাবে উল্টো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডে পরিণত হতে পারে, দিমাগি নকসাল’ তার নতুন উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


