নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজারে এখনো স্পষ্ট ভয়াবহ বন্যার ক্ষতচিহ্ন। কয়েক সপ্তাহ আগে বন্যার পানি নেমে গেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি ক্ষতিগ্রস্তরা। ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি, কাদায় ঢেকে থাকা জনপদ এবং নদীতে বিলীন হওয়া বসতভিটা এখনো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে সাম্প্রতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা।
সরেজমিন দেখা গেছে, ভোতেকোশী ও ত্রিশূলী নদীতীরবর্তী এলাকায় বহু পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়েছে। অনেকের চোখমুখে এখনো অনিশ্চয়তা ও হতাশার ছাপ। ঘরবাড়ি হারিয়ে তারা ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নতুন করে জীবন গড়ার চেষ্টা করছেন।
গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর ভয়াবহ বন্যায় নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, সড়ক ও সেতু ভেসে যায়। নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজার ছিল এই দুর্যোগে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি।
সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলো। কেউ স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ অস্থায়ীভাবে অন্যত্র বসবাস করছেন। আবার অনেকেই ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে নতুন করে জীবন শুরুর উপায় খুঁজছেন।
ঘর হারানো মানুষের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পুনর্বাসন। বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। কোথায় আশ্রয় নেবে, কীভাবে সন্তানদের নিয়ে জীবন চালাবে এবং নতুন করে ঘর নির্মাণ করবে—এসবই তাদের প্রধান উদ্বেগ।
ত্রিশূলী বাজার ও আশপাশের এলাকার অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের চিত্র প্রায় একই। কারো বসতঘর, কারো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আবার কারো জীবিকার একমাত্র অবলম্বন পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, সবকিছু হারিয়ে এখন তাদের সামনে নতুন করে জীবন গড়ার কঠিন সংগ্রাম।
ত্রিশূলী নদীর তীরঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বাজারটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, দুর্যোগ শুধু একটি মুহূর্তের ধ্বংস নয়; এর প্রভাব মানুষের জীবনে দীর্ঘদিন থাকে। বন্যার পানি কয়েক দিনের মধ্যে নেমে গেলেও মানুষের জীবনে তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণ হতে হয়তো অনেক বছর লাগবে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্যার সময় পানি ও স্রোত এত দ্রুত বেড়ে যায় যে, অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেওয়ার সুযোগও পায়নি। প্রাণ বাঁচাতে যে যার মতো নিরাপদ স্থানে ছুটেছেন। পরে ফিরে এসে দেখেছেন, যে ঘরটিকে তারা নিজেদের নিরাপদ আশ্রয় মনে করতেন, সেটিই আর নেই।
ত্রিশূলী বাজারের মানুষের কষ্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিখোঁজ স্বজনদের আতঙ্কও। নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং এখনো নিখোঁজ কয়েক হাজার। ফলে অনেক পরিবারের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ নেই। ঘর হারানোর পাশাপাশি তারা অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায়।
ত্রিশূলী নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়, প্রকৃতি যেন এক মুহূর্তে মানুষের বহু বছরের সঞ্চয় কেড়ে নিয়েছে। অথচ এই মানুষগুলোর চোখে শুধু কান্না নেই; আছে ঘুরে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষাও। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে কেউ ঘর বানানোর জায়গা খুঁজছেন, কেউ ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা করছেন, কেউ সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন।
বাজারের কিছু অংশে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে ফিরছে। মানুষজন চলাচল করছেন, কিছু দোকানপাট খোলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এ স্বাভাবিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর ক্ষত। অনেক পরিবারের কাছে এখন স্বাভাবিক জীবন মানে নতুন করে সবকিছু শুরু করা।
বন্যার ক্ষত শুধু ত্রিশূলী বাজারে নয়, নুয়াকোটসহ নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থায়ও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে ত্রিশূলীর মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন নিরাপদ আশ্রয় ও জীবিকা। ত্রাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন জরুরি। যারা ঘর হারিয়েছেন, তাদের জন্য টেকসই আবাসন; যারা ব্যবসা হারিয়েছেন, তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা আর যারা জীবিকা হারিয়েছেন, তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
ত্রিশূলী আজ শুধু একটি বন্যাকবলিত বাজারের নাম নয়, এটি নেপালের দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। ধ্বংসের মাঝেও যারা নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের চোখের সেই স্বপ্নই হয়তো একদিন আবার প্রাণ ফিরিয়ে দেবে ত্রিশূলী বাজারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


