চলমান ইরান যুদ্ধ এমন কিছু বাস্তবতা সামনে এনেছে, যা আগে খুব কম মানুষই অনুমান করতে পেরেছিলেন। দীর্ঘদিনের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় আকস্মিক পরিবর্তনে ঝুঁকিতে ছিল চীন। অর্থ্যাৎ, জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হলে চীনরে জন্য তা মাথাব্যথার করাণ হতো। কিন্তু বিপুল তেল মজুত, পরিশোধন সক্ষমতা এবং বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে সে দুর্বলতাকেই ভূরাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছে চীন। সংকটের সময় তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের বাজার সামলানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারেও প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা তৈরি করেছে বেইজিং।
তেল মজুতের পাশাপাশি পরিশোধন কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ চীনকে তুলনামূলক এই সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। ইরান যুদ্ধের শুরুতে জেট ফুয়েল, গ্যাস ও ডিজেলসহ পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে বেইজিং সে সক্ষমতাই দেখিয়েছে। এতে একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ অবস্থানে থাকা কিছু দেশ সরবরাহ সংকটে পড়েছে।
বিশ্বের জ্বালানিশিল্পের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ, সাধারণত সৌদি আরব ও আমেরিকার মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোই জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। চীন বড় তেল উৎপাদক না হলেও বিপুল মজুত ও বিশাল পরিশোধন সক্ষমতার কারণে এখন একই ধরনের কৌশলগত সুবিধা অর্জন করছে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় চীনবিষয়ক ইস্যুতে কাজ করা হোয়াইট হাউস ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক কর্মকর্তা জুলিয়ান গেওয়ার্টজ বলেন, বেইজিং যদি মনে করতে শুরু করে, এক্ষেত্রে তারা আগের ধারণার তুলনায় অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, তাহলে চীনের বৈশ্বিক কৌশল নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শুল্ক বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ইরান যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চীন তেল আমদানি ২৩ শতাংশ কমিয়েছে। বিপুল মজুত, পরিশোধন সক্ষমতা এবং বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করে অর্থনীতি পরিচালনার সামর্থ্য থাকায় দেশটি এমনটি করতে পেরেছে। বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর বেশি নির্ভরশীল দেশগুলো বেশি দামে তেল কিনতে অথবা ব্যবহার কমাতে বাধ্য হয়েছে।
চীনের তেল আমদানি কমিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা তেলশিল্পের প্রায় সবাইকেই বিস্মিত করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচল কঠোরভাবে সীমিত করার পরও অপরিশোধিত তেলের দাম বিশ্লেষকদের আশঙ্কা অনুযায়ী বাড়েনি। গোল্ডম্যান স্যাকসের তেলবিষয়ক গবেষণার প্রধান ডান স্ট্রুইভেনের মতে, আগস্টের শেষ নাগাদ অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে প্রায় ১০ ডলার কম ছিল, চীন যুদ্ধের আগের মাত্রায় তেল কিনলে দাম আরো বেশি হতো।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক এরিকা ডাইন্স বলেন, চীনের এমন সক্ষমতা রয়েছে, যা আগে খুব কম মানুষই ভেবেছিল। এখন দেখার বিষয়, বেইজিং নতুন এই ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহার করে।
ইরান যুদ্ধের শুরুতেই চীন পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। সরবরাহ সীমিত থাকাবস্থায় দেশটি যে সামান্য পরিমাণ জ্বালানি রপ্তানি করেছে, তার বড় অংশ গেছে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে। অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ভূখণ্ডগত দাবি নিয়ে বিরোধ থাকা অস্ট্রেলিয়া ও ফিলিপাইন সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ ধরনের পদক্ষেপ চুম্বক ও কম্পিউটার চিপ তৈরিতে ব্যবহৃত বিরল মৃত্তিকা ধাতু রপ্তানিতে চীনের আরোপিত বিধিনিষেধের কথাই মনে করিয়ে দেয়। ফলে তেল ও জ্বালানি সরবরাহও ভবিষ্যতে চীনের বৈদেশিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

