ইন্দোনেশিয়া প্রথমবারের মতো বিমানবাহী রণতরি (এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার) পেয়েছে। ইতালির কাছ থেকে পাওয়া ৪১ বছর বয়সী সাবেক যুদ্ধজাহাজটি শুক্রবার সকালে দেশটির উত্তর জাকার্তার তানজুং প্রিয়ক বন্দরের নৌঘাঁটিতে পৌঁছায়। সামরিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে জাহাজটিকে স্বাগত জানানো হয়।
ইতালীয় সাবেক যুদ্ধজাহাজ আইটিএস জিউসেপ গারিবাল্ডি স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন ও উল্লম্বভাবে অবতরণে সক্ষম বিমান এবং হেলিকপ্টার পরিচালনা করতে পারে। আগামী সপ্তাহে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীতে কমিশন পাবে। তখন এর নতুন নাম হবে কেআরআই গাজাহ মাদা। চতুর্দশ শতকের মাজাপাহিত সাম্রাজ্যের বিখ্যাত সামরিক নেতা গাজাহ মাদার নামে জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে।
ইতালি চলতি বছরের মার্চে অবসরপ্রাপ্ত এই রণতরিটি ইন্দোনেশিয়াকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালে গারিবাল্ডিকে ইতালীয় নৌবাহিনী থেকে অবসর দেওয়া হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো জোরদার করাই ছিল ইতালির অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে সাবমেরিন ও সামরিক উড়োজাহাজ বিক্রির সুযোগও খুঁজছে ইতালি। জাহাজটি উপহার দেওয়ার ফলে ইতালিকে এর অপসারণ ও নিষ্পত্তির ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে না।
গারিবাল্ডি যুক্ত হওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিমানবাহী রণতরি থাকা দেশের সংখ্যা দাঁড়াবে দুইয়ে। এর আগে একমাত্র থাইল্যান্ডের নৌবহরেই এমন জাহাজ ছিল। দেশটি ১৯৯৭ সালে স্পেনের কাছ থেকে এইচটিএমএস চাকরি নারুয়েবেত সংগ্রহ করে। এর সঙ্গে ক্যারিয়ার থেকে পরিচালনাযোগ্য এভি-৮এস মাতাদোর যুদ্ধবিমানও নেওয়া হয়েছিল।
তবে ইন্দোনেশিয়ার নতুন রণতরি নিয়ে ইতোমধ্যে দেশটির প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও বিরোধী রাজনীতিকদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। তাদের প্রশ্ন, হাজারো দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশটির আদৌ বিমানবাহী রণতরির প্রয়োজন আছে কি না। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপের সময়ে কয়েক দশক পুরোনো একটি যুদ্ধজাহাজ সংস্কার ও পরিচালনায় বিপুল অর্থ ব্যয় করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় বিমানবাহী রণতরি কর্মসূচির জন্য ৪৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের অনুমোদন দেয়। তবে কয়েকজন আইনপ্রণেতার আশঙ্কা, প্রকল্পটির মোট ব্যয় এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। পার্লামেন্টের কমিশন-১-এর সদস্য টিবি হাসানউদ্দিন বলেছেন, শুধু জাহাজটির আধুনিকায়ন ও সংস্কারেই প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বা ৯০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।

বিশ্বের বড় নৌ শক্তিগুলো সাধারণত নিজ দেশের উপকূল থেকে অনেক দূরে যুদ্ধবিমান পরিচালনার জন্য বিমানবাহী রণতরি ব্যবহার করে। তবে ইন্দোনেশিয়ার পরিকল্পনা কিছুটা ভিন্ন। দেশটি জাহাজটিকে মূলত মোবাইল কমান্ড সেন্টার ও সহায়তা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। হাজারো দ্বীপজুড়ে হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক অভিযান পরিচালনায় এটি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো বলেন, জাহাজটি নিয়মিতভাবে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া বন ও পিটভূমির আগুন মোকাবিলায় ব্যবহার করা যেতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এতে মাঝারি আকারের ১০টি পর্যন্ত হেলিকপ্টার রাখা সম্ভব হবে। ব্ল্যাক হক ও এমআই-১৭-এর মতো সক্ষমতার হেলিকপ্টারও এতে পরিচালনা করা যাবে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ পানি বহন করে আগুনে আক্রান্ত এলাকায় পাঠানো সম্ভব হবে।
প্রাবোও আরো জানিয়েছেন, রণতরি থেকে ড্রোন পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম চালানোর জন্য এটিকে একটি ভ্রাম্যমাণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ব্যবহার করা হবে। প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রায়ই ঘটে।
তবে একটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনার ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ মোকাবিলা—দুই ক্ষেত্রেই জাহাজটির কার্যকারিতা নিশ্চিত করার আগে এর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোর বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।
এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতেও বাড়ছে আর্থিক চাপ। প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর সরকার বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচিসহ বিভিন্ন ব্যয়বহুল উদ্যোগে অর্থ ব্যয় করছে। খাবারে বিষক্রিয়ার একাধিক ঘটনায় ওই কর্মসূচি নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, সরকারি রাজস্ব দুর্বল হওয়া এবং বাজেটের ওপর চাপ বাড়ার বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন। ফলে বড় সরকারি প্রকল্পে ব্যয়ের বিষয়টি আরো বেশি নজরদারির মধ্যে পড়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মুহাম্মদ ফওজান মালুফতি বলেন, গারিবাল্ডি সংগ্রহের সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রকৃত সামরিক প্রয়োজন এবং এটি পরিচালনার সক্ষমতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। শুধু জাতীয় গৌরব বা অন্য কোনো বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।
জাহাজটির বয়সের বিষয়টিও সরকারের কাছে স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের বিমানবাহী রণতরিকে সতর্কতামূলক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন ফওজান। তার মতে, পরিচালনাগত ও বাজেটসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে থাইল্যান্ডের রণতরিটি এর কর্মজীবনের বড় একটি সময় বন্দরে অবস্থান করেছে।
ফওজান বলেন, জাহাজটি পরিচালনা ও ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই জোর করে বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। তা হলে এর সুফলের চেয়ে ব্যয়ই বেশি হয়ে যেতে পারে। তার মতে, এই অর্থ বহরের ফ্রিগেটের সংখ্যা বাড়ানোর মতো অন্য অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রেও ব্যয় করা যেতে পারে।
ইনস্টিটিউট ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের সামরিক বিশ্লেষক খাইরুল ফাহমিও মনে করেন, ইন্দোনেশিয়ার জন্য বিমানবাহী রণতরি এখন অগ্রাধিকার নয়। তার মতে, দেশের আঞ্চলিক জলসীমায় সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের অবাধ তৎপরতা ঠেকানোই ইন্দোনেশিয়ার মূল প্রতিরক্ষা লক্ষ্য হওয়া উচিত।
এ ক্ষেত্রে সাবমেরিন, ফ্রিগেট এবং অসমমিত যুদ্ধব্যবস্থায় বিনিয়োগ ইন্দোনেশিয়ার জন্য বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তবে ইন্দোনেশিয়া যদি নিজেকে একটি বড় সামুদ্রিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে বিমানবাহী রণতরি জাতীয় শক্তির প্রতীক হওয়ার পাশাপাশি সামরিক ও বেসামরিক—দুই ধরনের নানা কাজে ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে বলেও উল্লেখ করেন খাইরুল ফাহমি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


