বিদ্যুৎ সরবরাহের ধারাবাহিকতা এখন শুধু দেশে কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না। কোন উৎস থেকে বিদ্যুৎ আসছে, সেই উৎসগুলোর মধ্যে ভারসাম্য কতটা, বড় কোনো কেন্দ্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিড তা সামাল দিতে পারে কি না এবং দ্রুত বিকল্প উৎপাদন বা সরবরাহ ব্যবস্থা সক্রিয় করার সক্ষমতা কতটা—এসব প্রশ্নও বিদ্যুৎ নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাম্প্রতিক কারিগরি ত্রুটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থার এই বাস্তবতাটিই নতুন করে সামনে এনেছে।
আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ইউনিট-২ কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ৮৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ১৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে পুনরায় যুক্ত হয়েছে। দুপুর ১২টা ৪ মিনিটে ইউনিটটি গ্রিডের সঙ্গে সিঙ্ক্রোনাইজ করা হয়। একটি বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটের কয়েক দিন বন্ধ থাকা যে জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎপর্যপূর্ণ চাপ তৈরি করতে পারে, এই ঘটনাটি তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
ইউনিটটি বন্ধ থাকার সময়ে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি একপর্যায়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। কিছু সময়ে লোডশেডিং প্রায় ৩ হাজার ১০০ মেগাওয়াটে পৌঁছায়। ওই সময়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল, বিপরীতে জাতীয় চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হলে একটি বড় কেন্দ্রের অনুপস্থিতি কীভাবে সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ ঘাটতির চাপ বাড়াতে পারে, গোড্ডার ঘটনা সেটি স্পষ্ট করেছে।
বাংলাদেশের জন্য আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ আমদানি অবশ্যই বিদ্যুৎ নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভারতের বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ আমদানির মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত সরবরাহ যুক্ত হয়েছে এবং উৎপাদন ঘাটতির সময়ে তা চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং ক্রমবর্ধমান গৃহস্থালি চাহিদার সময়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি একটি বাস্তবসম্মত সরবরাহ উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।
কিন্তু বিদ্যুৎ আমদানি এবং আমদানিনির্ভরতা—দুটি বিষয় এক নয়। আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য একটি দেশের সরবরাহ ব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করতে পারে; আবার কোনো একটি বড় আমদানি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা উল্টো ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। গোড্ডার একটি ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিটের সাময়িক অচলাবস্থায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, সেটি দেখিয়েছে জাতীয় গ্রিডের নির্ভরযোগ্যতা শুধু মোট উৎপাদন সক্ষমতার হিসাব দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘রিজার্ভ মার্জিন’ বা অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা। স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় চাহিদা মেটানোর মতো বিদ্যুৎ থাকা যথেষ্ট নয়; বড় কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল হলে, জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে কিংবা কোনো সঞ্চালন লাইন বিচ্ছিন্ন হলে দ্রুত বিকল্প সরবরাহ দেওয়ার মতো অতিরিক্ত সক্ষমতাও থাকতে হয়। একটি নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎব্যবস্থায় এই অতিরিক্ত সক্ষমতা অনেকটা নিরাপত্তা বেষ্টনীর মতো কাজ করে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থায় তাই উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি ‘ফ্লেক্সিবিলিটি’ বা দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো-কমানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র, তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ আমদানি এবং ভবিষ্যতে ব্যাটারি স্টোরেজ—এসব উৎসকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে পারলে কোনো একটি উৎসের সাময়িক বিপর্যয়ের প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে বিকল্প সক্ষমতা তৈরির অর্থ অকার্যকর বা ব্যয়বহুল বিদ্যুৎকেন্দ্র শুধু ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে বসিয়ে রাখা নয়। এর সঙ্গে অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা এবং গ্রিড পরিচালনার ব্যয় জড়িত। ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন একটি বিদ্যুৎ পরিকল্পনা, যেখানে উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আকস্মিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকেও হিসাবের মধ্যে রাখা হবে।
গোড্ডার ঘটনা সঞ্চালনব্যবস্থার গুরুত্বও সামনে এনেছে। উৎপাদন কেন্দ্র থাকলেই বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় না; বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিড এবং সেখান থেকে বিতরণব্যবস্থার প্রতিটি স্তর নির্ভরযোগ্য হতে হয়। একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে অন্য কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ এনে ঘাটতি পূরণ করার সক্ষমতা যেমন দরকার, তেমনি সেই বিদ্যুৎ দ্রুত সঞ্চালনের মতো গ্রিড অবকাঠামোও প্রয়োজন।
এখানে ‘গ্রিড রেজিলিয়েন্স’ বা সংকট-সহনশীলতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় কেন্দ্র বন্ধ হলে কোন কেন্দ্র কত দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারবে, কোন অঞ্চলে কতটা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব, কোন সঞ্চালন লাইন অতিরিক্ত চাপ নিতে পারবে এবং কোথায় সাময়িক লোড কমাতে হবে—এসব বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে এই সক্ষমতা তৈরি হয় না; প্রয়োজন আধুনিক গ্রিড ব্যবস্থাপনা, পূর্বাভাস, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা।
আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি বাংলাদেশের জন্য সরবরাহের একটি অতিরিক্ত উৎস হতে পারে। কিন্তু কোনো একটি উৎসের ওপর এমন নির্ভরতা তৈরি করা উচিত নয়, যার সাময়িক কারিগরি ত্রুটি, জ্বালানি সমস্যা, সীমান্তবর্তী অবকাঠামোগত বিপর্যয় বা অন্য কোনো কারণে জাতীয় গ্রিডে বড় ঘাটতি সৃষ্টি হয়। সরবরাহের উৎস যত বৈচিত্র্যময় হবে, একটি নির্দিষ্ট উৎসের সমস্যার প্রভাব ততটা সীমিত রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে দেশের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার কার্যকর ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। কাগজে-কলমে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা এবং বাস্তবে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, তা সবসময় এক নয়। জ্বালানি সংকট, যন্ত্রপাতির ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিংবা সঞ্চালন সমস্যার কারণে অনেক সময় স্থাপিত সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যায় না। তাই নতুন কেন্দ্র স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি সরবরাহ এবং দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।
ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভূমিকাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস উৎপাদন ব্যবস্থাকে বৈচিত্র্যময় করতে পারে। তবে সৌর ও বায়ুর মতো উৎসের উৎপাদন আবহাওয়া-নির্ভর হওয়ায় এগুলোর সঙ্গে গ্রিড ব্যবস্থাপনা, স্টোরেজ এবং দ্রুত সমন্বয়যোগ্য অন্যান্য উৎপাদন উৎসের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানোও একটি বৃহত্তর সমন্বিত গ্রিড পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ নিরাপত্তার সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সম্পর্কও সরাসরি। শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল অবকাঠামো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘ বা অনিয়মিত লোডশেডিং উৎপাদন ব্যাহত করে, শিল্পের পরিচালন ব্যয় বাড়ায় এবং বিনিয়োগের পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা কেবল জ্বালানি খাতের বিষয় নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি মৌলিক অবকাঠামোগত শর্ত।
গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮০০ মেগাওয়াট ইউনিট পুনরায় গ্রিডে যুক্ত হওয়ায় তাৎক্ষণিক একটি সরবরাহ সংকট কমেছে। কিন্তু ঘটনাটির দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা আরো গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় বিদ্যুৎব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে কোনো একটি বড় কেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে পুরো ব্যবস্থায় বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি না হয়।
এ জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসের বৈচিত্র্য, পর্যাপ্ত রিজার্ভ মার্জিন, নির্ভরযোগ্য সঞ্চালনব্যবস্থা, দ্রুত চালু করা যায় এমন উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা এবং আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ আমদানির পাশাপাশি নিজস্ব বিকল্প সক্ষমতা—সবগুলোকে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। বিদ্যুৎ আমদানি বাংলাদেশের প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু আমদানির পাশাপাশি বিকল্প সক্ষমতা না থাকলে সরবরাহব্যবস্থা কোনো একক উৎসের সমস্যার কাছে বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
সুতরাং বিদ্যুৎ নিরাপত্তার লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘চাহিদার সমান বিদ্যুৎ উৎপাদন’ নয়; বরং এমন একটি স্থিতিস্থাপক ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে একটি বড় কেন্দ্র বন্ধ হলেও গ্রিড দ্রুত বিকল্প উৎসে সরে যেতে পারে। গোড্ডার ঘটনা সেই সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎনীতি তাই আমদানি বনাম দেশীয় উৎপাদনের সরল বিতর্কের বাইরে গিয়ে ‘বৈচিত্র্যময় উৎস, পর্যাপ্ত বিকল্প সক্ষমতা এবং স্থিতিস্থাপক গ্রিড’—এই তিনটি ভিত্তির ওপর গড়ে তোলাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর, দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ ও টাইমস অব ইন্ডিয়া
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


