পরিবারে বিরোধ মেটানো থেকে শুরু করে সামাজিক সংঘাত প্রশমিত করা—শান্তি প্রতিষ্ঠায় মায়েদের ভূমিকা অনেক সমাজেই দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে খুব কমই স্বীকৃতি পেয়েছে। ফিলিপাইনের তালান্দিগ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, মায়েরা কীভাবে পরিবার, সম্প্রদায় এমনকি বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার বিরোধ নিরসনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।
ভারতের সমাজবিজ্ঞানী ড. সুধাংশুবালা সাহু সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ফিলিপাইনের বুকিদনন প্রদেশের তালান্দিগ জনগোষ্ঠীর শান্তি প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতি তুলে ধরেছেন। তার মতে, সেখানে মায়েদের শুধু সন্তান লালন-পালনকারী হিসেবে দেখা হয় না; পরিবার ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে তা প্রশমিত করার দায়িত্বও তারা গ্রহণ করেন। এক প্রবীণ নারী লেখককে বলেছেন, তারা সবাই মা এবং তাই শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী।
তালান্দিগ সমাজের এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বোধ—বিরোধে জড়িত প্রত্যেক সন্তানই কারও না কারও সন্তান। ফলে সংঘাতকে জয়-পরাজয়ের বিষয় হিসেবে না দেখে সম্পর্ক রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বিরোধ নিষ্পত্তিকে কেবল আইনি বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া না বানিয়ে মানবিক সম্পর্ক রক্ষার একটি সামাজিক দায়িত্বে পরিণত করে।
ভারতের সমাজেও এর নানা নজির রয়েছে। লেখক জিজাবাই ও ভিদ্যাবতীর মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের উদাহরণ টেনেছেন। একই সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠী, স্থানীয় নারী সংগঠন ও মণিপুরের মেইরা পাইবি আন্দোলনের কথাও উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এসব উদ্যোগের মধ্যে বিরোধ প্রশমন, সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং সামাজিক সংহতি রক্ষার নানা উপাদান রয়েছে।
বিশেষ করে মণিপুরের মেইরা পাইবি বা ‘নারী মশালবাহক’ আন্দোলনের প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে এই নারীরা সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান, সম্প্রদায়ের সুরক্ষা এবং জবাবদিহির দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। ফলে মায়ের সামাজিক ভূমিকা কখনো কখনো পারিবারিক পরিসর অতিক্রম করে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরেও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে মায়েদের শান্তি-নির্মাতা হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। মাতৃত্ব নিজে কোনো ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংঘাত-নিরসনকারী করে তোলে না। শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকার জন্য প্রয়োজন সামাজিক আস্থা, যোগাযোগের সুযোগ, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর। তাই বিষয়টি শুধু ‘মায়ের নৈতিক দায়িত্ব’ হিসেবে দেখলে এর প্রাতিষ্ঠানিক দিকটি উপেক্ষিত হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবার ও সম্প্রদায়ভিত্তিক বিরোধের বড় একটি অংশ স্থানীয় পর্যায়েই তৈরি ও সমাধান হয়। সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক সময় আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে ঘটে। পারিবারিক মধ্যস্থতা, প্রতিবেশী বিরোধ মীমাংসা, নারী সমিতি, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং স্থানীয় সামাজিক উদ্যোগ—এসব ক্ষেত্রকে শান্তি প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
শান্তি প্রতিষ্ঠাকে যদি শুধু রাষ্ট্রীয় চুক্তি, কূটনৈতিক আলোচনা কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়, তাহলে মায়েদের ভূমিকার গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব। কারণ সংঘাতের প্রথম অভিঘাত প্রায়ই পরিবারে পড়ে এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্ম বহন করে।
এই জায়গায় ‘মা’ একটি প্রতীকও বটে—যত্ন, সহমর্মিতা, দায়িত্ব এবং সম্পর্ক রক্ষার প্রতীক। কিন্তু সেই প্রতীককে বাস্তব সামাজিক শক্তিতে পরিণত করতে হলে নারীদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় নেতৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনায় নারীদের অংশগ্রহণ তাই কেবল মানবিকতার প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ফিলিপাইনের তালান্দিগ সমাজের অভিজ্ঞতা এবং ভারতের বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের উদাহরণ অন্তত একটি প্রশ্ন সামনে আনে—যে নারীরা পরিবার ও সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, শান্তি ও সংঘাত-নিরসনের নীতিনির্ধারণে তাদের অভিজ্ঞতা কতটা জায়গা পাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দক্ষিণ এশিয়ার সমাজগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


