নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

অস্ত্র তৈরিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে হুথিরা

অস্ত্র তৈরিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে হুথিরা
ইয়েমেনের সানায় পাহারারত হুথি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

হুথি বলতেই সাধারণত চোখে ভেসে ওঠে কাঁধে একে-৪৭ ঝোলানো মরুভূমির যোদ্ধাদের ছবি। তবে গত এক দশকে ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। হাজার মাইল দূরে ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, লোহিত সাগরে ড্রোন দিয়ে জাহাজে হামলা এবং উন্নত অস্ত্র তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের উদ্যোগÑসব মিলিয়ে ইরানের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে হুথিরা। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হুথিরা সাম্প্রতিক তেহরান-ওয়াশিংটনের যুদ্ধের শুরুতে কয়েক মাস তুলনামূলকভাবে নীরব ছিল। কিন্তু জুলাইয়ে সৌদি জাহাজে অবরোধ আরোপের মধ্য দিয়ে তারা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে যোগ দেয়।

বিজ্ঞাপন

পরে তারা সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা এবং জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে লোহিত সাগরে নৌ চলাচলে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইয়েমেনে আমেরিকার সাবেক বিশেষ দূত টিম লেন্ডারকিং বলেন, নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য হুথিরা প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। তার মতে, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নন-স্টেট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তারা এখন সর্বোচ্চ অস্ত্রধারী গোষ্ঠী।

সম্প্রতি এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে অ্যানথ্রপিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর ইয়েমেনে অবস্থানকারী একটি হুমকি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ক্লড এআই ব্যবহার করে গাইডেড অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেছে। অ্যানথ্রপিকের নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তারা একটি নির্দেশিত রকেটের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ পর্যন্ত এগিয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। উত্তর ইয়েমেনেই হুথিদের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত।

হুথিরা এখনো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে ইরানের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নিজেদের অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা তারা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

যুদ্ধের পরীক্ষাগার থেকে উৎপাদন কেন্দ্র

হুথি ও তাদের ইরানি উপদেষ্টারা প্রায় এক দশক আগে চালকবিহীন জলযান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। ২০১৭ সালে বিস্ফোরকবোঝাই একটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত নৌকা দিয়ে সৌদি আরবের একটি ফ্রিগেটে হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় দুজন নিহত হন।

২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর সৌদি আরব দেশটির সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক জোট গঠন করে। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই সময়কে হুথিরা পুনর্গঠন, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সংস্কার এবং মজুত বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করেছে।

লেন্ডারকিং বলেন, যুদ্ধবিরতি হুথিদের পুনর্গঠিত হওয়া, নতুন করে প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং অস্ত্র-সরঞ্জামের মজুত পূরণের সুযোগ দিয়েছে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিটার স্যালিসবারি বলেন, প্রথম দিকে ইরানের যুদ্ধ কৌশল ও সামরিক সক্ষমতা পরীক্ষার জন্য ইয়েমেন ছিল একটি ‘পরীক্ষাগার’। এখন সেটি ক্রমেই ‘উৎপাদন কেন্দ্রে’ পরিণত হচ্ছে। তার মতে, ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামোর মতো বড় যন্ত্রাংশ এখন ইরান থেকে পাঠানোর পরিবর্তে হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায়ই তৈরি করা হচ্ছে।

স্যালিসবারি বলেন, ইরান ও হিজবুল্লাহ অস্ত্র তৈরি ও ব্যবহারে হুথিদের দক্ষতা বাড়াতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ফলে ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোনের মতো বিভিন্ন অস্ত্রের অনেকাংশই তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় উৎপাদন করতে পারছে।

বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা

ইরানের উৎসাহে চীনের মতো বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ত্রের উপাদান সংগ্রহে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলেছে হুথিরা। মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক পঞ্চম ফ্লিট কমান্ডার কেভিন ডানেগান বলেন, বৈশ্বিক কালোবাজারের সরবরাহব্যবস্থা ব্যবহার করে নিজেদের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ উপাদান সংগ্রহ করতে পারায় হুথিদের এখন অনেক কিছুর জন্য সরাসরি ইরানের ওপর নির্ভর করতে হয় না।

ডানেগানের দায়িত্বের আওতায় পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরও ছিল। হুথিদের প্রতি ইরানের সহায়তা নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি প্রথম ইন্টেলিজেন্স ফিউশন সেল বা গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় ইউনিট গড়ে তুলেছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন