জ্বালানি সংকটে ইউরোপ, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ

জ্বালানি সংকটে ইউরোপ, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ
ছবি: এএফপি

উপসাগর ও ইউরেশিয়ার সংঘাতে ইউরোপের তেল ও গ্যাস সরবরাহ একসঙ্গে চাপে পড়েছে। শুক্রবার সৌদি আরব ইউরোপের শোধনাগারগুলোকে জানিয়েছে আগামী মাসে তাদের কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল সরবরাহের আশা না করতে। এতে ইউরোপের জ্বালানি সংকট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে মূল্যস্ফীতিতে।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একাধিক জ্বালানি সরবরাহপথ এখন ঝুঁকিতে। পূর্ব ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর, হরমুজ প্রণালি, কৃষ্ণসাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের সংঘাত ও উত্তেজনা সরবরাহব্যবস্থাকে চাপে ফেলেছে।

লোহিত সাগরে হুথি বাহিনীর অগ্রযাত্রাও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ১০ সেপ্টেম্বর তারা মোখা বন্দর এবং ১১ সেপ্টেম্বর বাব আল-মান্দেব প্রণালির মায়ুন বা পেরিম দ্বীপ দখল করে। ১৪ সেপ্টেম্বর গ্রেটার ও লেসার হানিশ দ্বীপপুঞ্জও দখলের খবর পাওয়া যায়। এসব এলাকা তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথে অবস্থিত।

বাব আল-মান্দেব এখনো বন্ধ হয়নি। তবে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে। যুদ্ধঝুঁকির বিমার খরচও বেড়েছে। অনেক জাহাজ এখন আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাচ্ছে। এতে যাত্রায় ১০ থেকে ১৪ দিন সময় বাড়ছে এবং সরবরাহ খরচও বাড়ছে।

এর আগে বছরের শুরুতে কয়েক মাস হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজার থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ১ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ কমে যায়। ইউরোপ তখন আটলান্টিক অববাহিকা ও কাস্পিয়ান অঞ্চলের সরবরাহের ওপর বেশি নির্ভর করে।

সৌদি আরব পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠিয়ে সংকটের কিছুটা প্রভাব সামাল দিয়েছিল। এ পথে সরবরাহ বছরের শুরুতে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল থেকে বেড়ে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেলে উঠেছিল। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর একটি পাম্পিং স্টেশনে ড্রোন হামলার পর পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যায়। কবে তা চালু হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের জ্বালানি ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান কনস্টানতিনোস স্টামবোলিস বলেন, জ্বালানি সংকট এখন বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। ইউরোপে এর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতি ১৪ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

রাশিয়া-কাজাখস্তানেও ঝুঁকি

রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাতও ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহে চাপ বাড়াচ্ছে। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার শোধনাগার ও রপ্তানি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে ইউরোপের নিষেধাজ্ঞায় বিকল্প সরবরাহ সীমিত।

ইউরোপের জন্য সম্ভাব্য বিকল্প উৎস কাজাখস্তানও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। দেশটির ৮০ শতাংশের বেশি তেল রপ্তানি হয় সিপিসি পাইপলাইনের মাধ্যমে। এই পাইপলাইন রাশিয়ার নভোরোসিস্ক বন্দরে গিয়ে শেষ হয়েছে। ইউক্রেন সেখানে হামলা চালালে কাজাখস্তানের রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে।

কাজাখস্তানের জন্য কাস্পিয়ান সাগর হয়ে আজারবাইজান ও তুরস্কের পথটি বিকল্প হতে পারে। তবে বাকু-সুপসা পাইপলাইনের সক্ষমতা দৈনিক মাত্র ১ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। কাজাখস্তানের স্বাভাবিক রপ্তানির তুলনায় তা অনেক কম। অতিরিক্ত তেল বাকু-তিবিলিসি-জেয়হান পাইপলাইন দিয়েও পাঠানো সম্ভব।

তবে কাস্পিয়ান পথও ঝুঁকিমুক্ত নয়। ২৫ জুলাই ইউক্রেনের একটি ড্রোন কাস্পিয়ান সাগরে একটি ইরানি জাহাজে হামলা চালায়। কাজাখস্তান পশ্চিমে তেল পাঠাতে না পারলে চীন তাদের প্রধান ক্রেতায় পরিণত হতে পারে। এতে ইউরোপের জন্য সরবরাহ আরো কমবে।

শীত ও নতুন বিধিনিষেধের চাপ

আগামী শীতের আবহাওয়াও ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রিস্ট্যাড এনার্জি ও আইসিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনো আবহাওয়ার ধরন ইউরোপের জ্বালানি চাহিদায় প্রভাব ফেলতে পারে। শীতের শুরু উষ্ণ হলেও ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এ তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হলে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়তে পারে।

আইসিসের ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, শক্তিশালী এল নিনোর সময় শীতকালে ইউরোপের বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন ৯ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরো বেশি গ্যাস ব্যবহার করতে হতে পারে।

এর সঙ্গে ২০২৭ সালে কার্যকর হতে যাওয়া ইইউর মিথেনবিষয়ক নতুন নিয়মও সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন নিয়মে গ্যাস ও এলএনজি আমদানিকারকদের বিদেশি উৎপাদকদের পরিবেশগত মান পূরণের প্রমাণ দিতে হবে। অনেক উৎপাদনকারীর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও তথ্যব্যবস্থা নেই। ফলে মানদণ্ড পূরণকারী গ্যাসের দাম বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে ইউরোপের জ্বালানি সংকট এখন শুধু সরবরাহের সমস্যা নয়। এর প্রভাব শিল্প উৎপাদন ও মূল্যস্ফীতিতেও পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও স্বল্পমেয়াদে সংকট সামাল দিতে ইউরোপের সামনে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন