গুলাম আহমদ মাহজুর

কাশ্মীরের ক্লাসিক কবি

কাশ্মীরের ক্লাসিক কবি

বিপ্লবী কবি গুলাম আহমদ মাহজুর, যিনি শায়ের-এ-কাশ্মীর (কাশ্মীরের কবি) নামে সুপরিচিত, ১৮৮৭ সালের ১ আগস্ট কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার মিত্রিগাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কাশ্মীরি কবিদের মধ্যে মাহজুর বিশেষ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত। বিশেষ করে দুটি কারণে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

প্রথমত, তিনি কাশ্মীরি কবিতায় একটি নতুন শৈলী বা ধারা প্রবর্তন করেন। দ্বিতীয়ত, তিনি কাশ্মীরি কবিতায় নতুন চিন্তা ও ভাবধারা যুক্ত করেন।

মাহজুর কাশ্মীরি ভাষায় স্বাধীনতা ও অগ্রগতির গান লিখেছিলেন। তার এই গানগুলো ঘুমন্ত কাশ্মীরিদের জাগিয়ে তুলেছিল। তিনি কাশ্মীরি সাহিত্যে এক নতুন কণ্ঠস্বর এবং নতুন সাহিত্যরূপ নিয়ে আসেন।

মাহজুরের প্রকৃত নাম ছিল গুলাম আহমদ। কিন্তু কবি হিসেবে তিনি ‘মাহজুর’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন এবং তাই তিনি গুলাম আহমদ মাহজুর নামে পরিচিত হন। তিনি কাশ্মীরি ভাষায় কবিতা লিখতেন। পারসিক (ফারসি) ও উর্দু ভাষায়ও লিখেছেন। কাশ্মীরে তিনি একজন পাটওয়ারি (ভূমি-রেকর্ড কর্মকর্তা) হিসেবে কাজ করতেন।

১৯১৮ সালে তার প্রথম কাশ্মীরি কবিতা প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি কাশ্মীরি ভাষাতেই কবিতা লিখতে থাকেন। তার গানগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি প্রেম, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক সংস্কার এবং কাশ্মীরিদের দুর্দশা নিয়ে কবিতা লিখেছেন। এছাড়া তিনি যুবসমাজ, নিশাত বাগানের ফুল, এক কৃষক-কন্যা, এক মালী, সোনালি পাখি (Golden Oriole) এবং একটি স্বাধীন কাশ্মীর নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন। সেই সময় কাশ্মীরি কবিতায় এমন বিষয়বস্তু প্রায় অজানা ছিল। মাহজুরই প্রথম এসব বিষয় কাশ্মীরি কবিতায় নিয়ে আসেন।

১৯৫২ সালে ৬৭ বছর বয়সে গুলাম আহমদ মাহজুর মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যু কাশ্মীরি ভাষা ও কাশ্মীরি কবিতার জন্য এক বড় ক্ষতি ছিল। তবে আজও তার গান কাশ্মীরের মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। তার এই গানগুলোর মাধ্যমেই তার নাম চিরদিন বেঁচে থাকবে।

কাশ্মীরি ভাষায় শিক্ষামূলক (didactic) কবিতার পথিকৃৎ হিসেবেও তাকে বিবেচনা করা হয়। তিনিই প্রথম কাশ্মীরি কবি, যিনি তার যুগের

বাস্তব জীবন ও সমাজকে কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে গ্রহণ করেন। তবু তার গীতিকবিতার আকর্ষণ কিংবদন্তি কবি হাব্বা খাতুনের কবিতার মতোই মোহনীয়।

কাশ্মীরে প্রথমবারের মতো তার কবিতায় জাতীয় জাগরণ ও পুনর্জাগরণের ভাব প্রকাশ পায়। পুরোনো কাশ্মীরি কবিতা থেকে আধুনিক ধারায় উত্তরণের ক্ষেত্রে তিনি এক মহিরুহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

মাহজুরের ওপর একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এ কারণে তিনি কাশ্মীরের একমাত্র কবি যিনি জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তির মর্যাদা অর্জন করেছিলেন।

গুলাম আহমদ মাহজুরের বিখ্যাত কবিতা

এসো হে মালী

এসো হে মালী!

এসো, নতুন বসন্তের মহিমা সৃষ্টি করতে।

এমন এক বসন্ত,

যেখানে ফুল ফুটবে,

আর বুলবুলি গান গাইবে।

বাগান আজ নির্জন,

শিশির যেন শোক করছে।

ছেঁড়া পোশাক পরে থাকা ফুলগুলো

দেখায় হতবিহ্বল ও বিষণ্ণ।

এসো হে মালী!

ফুলগুলোকে আবার প্রাণ দাও,

বুলবুলিকে আবার সজীব করে তোলো।

এসো হে মালী!

ফুলের বাগান থেকে কাঁটাঝোপ সরিয়ে ফেলো,

আর দেখো সারি সারি হায়াসিন্থ ফুল।

এসো, এই বাগানকে হাসিমুখে ভরিয়ে দাও।

খাঁচায় বন্দি যে পাখি শোক করছে,

তাকে মুক্ত করবে কে?

হে মালী,

নিজের স্বাধীনতা তোমাকেই অর্জন করতে হবে।

জেগে ওঠো, হে মালী!

বুঝে নাও—

ক্ষমতা ও সম্পদ,

আরাম ও রাজত্ব—

সবকিছুই তোমার পায়ের নিচে থাকবে

যখন তুমি নিজেকে চিনতে পারবে।

হে মালী!

এসো হে মালী,

তোমার বাগানকে জাগিয়ে তুলতে।

ফুলের কান্নাকে বিদায় জানাতে,

বুলবুলির বিষাদকে বিদায় জানাতে।

আর—

একটি ভূমিকম্প ঘটাও,

একটি ঝড় তুলো,

গর্জনকারী বজ্রধ্বনি আনো,

একটি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি করো।

কবিতার ভেতর পৃথিবী

কাশ্মীরি কবি মাহজুর-এর বিখ্যাত কবিতা Walo Ha Bagwano (এসো হে মালী) কাশ্মীরি সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও জাগরণধর্মী কবিতা। এটি শুধু প্রকৃতিকেন্দ্রিক কবিতা নয়; বরং এতে গভীর জাতীয় চেতনা, সামাজিক সংস্কার এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রতীকীভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

কবিতাটির প্রধান কয়েকটি শব্দ প্রতীক, অর্থ ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন, যাতে স্পষ্ট হয়ে যায় কাশ্মীরি জীবনে অনিবার্য প্রসঙ্গগুলো।

১. ‘মালী’ (Gardener) প্রতীক, কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো মালী। এখানে ‘মালী’ বলতে শুধু বাগানের পরিচর্যাকারী বোঝানো হয়নি। এটি আসলে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যুবসমাজের প্রতীক। মাহজুর বলতে চেয়েছেন—কাশ্মীরকে পরিবর্তন করতে বাইরের কেউ আসবে না; কাশ্মীরের মানুষকেই নিজের ভাগ্য নিজে গড়তে হবে।

এ কারণে তিনি বলেন : স্বাধীনতা তোমাকেই অর্জন করতে হবে।

২. ‘বাগান’ (Garden) প্রতীক, কবিতার ‘বাগান’ আসলে কাশ্মীরকে বোঝায়। কাশ্মীরকে দীর্ঘদিন ধরে বলা হয় ‘পৃথিবীর বেহেশত’। সেই বেহেশত যেন অবহেলা ও অত্যাচারের কারণে ধ্বংসপ্রায়। কবিতায় বাগানকে বলা হয়েছে—নির্জন, বিষণ্ণ, অবহেলিত, এটি কাশ্মীরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পতনের প্রতীক।

৩. ‘ফুল’ ও ‘বুলবুলি’ প্রতীক কবিতায় ‘ফুল’ এবং ‘বুলবুলি’ গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ফুল (Gul) ফুল বোঝায়—কাশ্মীরের সৌন্দর্য, সংস্কৃতি মানুষ, ছেঁড়া পোশাক পরা ফুল মানে অবহেলিত ও নিপীড়িত জনগণ। বুলবুলি (Bulbul), বুলবুলি বোঝায়—শিল্প গান, স্বাধীনতার কণ্ঠস্বর, যখন বুলবুলি গান গাইতে পারে না, তখন বোঝায় সমাজে স্বাধীনতা নেই।

৪. আগাছা ও কাঁটাঝোপের প্রতীক, বলা হয়েছে—সমাজে যেসব জিনিস অগ্রগতিকে বাধা দেয় সেগুলো দূর করতে হবে। যেমন—অজ্ঞতা, সাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক অন্যায়, শোষণ। মাহজুর ছিলেন সামাজিক সংস্কারের কবি, তাই তিনি কাশ্মীরি সমাজকে নতুনভাবে গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

৫. ঝড়, ভূমিকম্প ও বজ্রধ্বনি কবিতার শেষে কবি বলেন—ভূমিকম্প আনো, ঝড় তুলো, বজ্রধ্বনি সৃষ্টি করো, এগুলো প্রকৃতির ঘটনা নয়; বরং বিপ্লবের প্রতীক। এর অর্থ—অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সামাজিক জাগরণ, রাজনৈতিক পরিবর্তন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আজকের কাশ্মীরের বাস্তবতা : এই কবিতা লেখা হয়েছিল সে সময় যখন কাশ্মীর ছিল ডোগরা শাসনের অধীনে। সে সময়—কৃষকদের ওপর অত্যাচার ছিল, রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত ছিল দারিদ্র্য ও বৈষম্য ছিল প্রবল, এ অবস্থায় মাহজুরের কবিতা মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও আত্মসম্মানবোধ জাগিয়ে তোলে। বর্তমান পরিস্থিতিও তেমন উন্নত নয়। যেই তিমির সেই অন্ধকার রয়ে গেছেই।

কাশ্মীর অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং জনগণের অধিকার প্রশ্নের একটি জটিল মিশ্রণ। স্বাধীনতাকামী বা অধিক স্বায়ত্তশাসনপ্রত্যাশী জনগণের সঙ্গে ভারত সরকারের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই উত্তেজনাপূর্ণ। ভারত সরকার এ অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ দমন ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তিতে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। কিন্তু এই কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, ঘন ঘন তল্লাশি এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আটক। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে যে নিরাপত্তা আইনের আওতায় দীর্ঘ সময় বিচার ছাড়াই মানুষকে আটক রাখা হয়। এছাড়া ইন্টারনেট বন্ধ রাখা বা সীমিত করার ঘটনাও বারবার ঘটেছে, যা শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে; সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা নানা ধরনের চাপ এবং নজরদারির অভিযোগ তুলেছেন।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অস্থিরতা লক্ষ করা যায়। স্থানীয় নেতাদের গৃহবন্দি বা গ্রেপ্তারের ঘটনা রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে বলে সমালোচনা রয়েছে। ফলে জনগণের একটি অংশ নিজেদের মতামত প্রকাশ ও অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত মনে করে।

অন্যদিকে, ভারত সরকার দাবি করে যে এসব পদক্ষেপ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয়। তাদের মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর ব্যবস্থা অপরিহার্য। ফলে কাশ্মীরের বাস্তবতা একপক্ষীয় নয়; এটি মানবাধিকার, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার জটিল সমন্বয়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও একটি সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে আলোচিত হচ্ছে কিন্তু সমাধানের কারো কোনো উদ্যোগ নেই। নির্মম একটি পর্যায় অতিক্রম করছে কাশ্মীরি জনগণ।

শেষ নুক্তা

তার কবিতা কাশ্মীরি সাহিত্যে একটি নতুন যুগের সূচনা করে। কারণ প্রথমবার কবিতায় জনগণের জীবন ও সংগ্রাম উঠে আসে। কবিতা হয়ে ওঠে জাতীয় জাগরণের মাধ্যম। প্রকৃতির ভাষায় রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়। এ কারণে অনেক সাহিত্য সমালোচক মাহজুরকে বলেন—কাশ্মীরি জাতীয় চেতনার কবি। ‘Walo Ha Bagwano’ কবিতাটি আসলে একটি জাগরণী আহ্বান। এখানে কবি কাশ্মীরের মানুষকে বলছেন—নিজের শক্তি চিনতে, সমাজকে সংস্কার করতে, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন