ইরান যুদ্ধ ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত ভুল সিদ্ধান্ত। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রতিপক্ষদের নিবৃত্ত করা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। বিবিসির সাংবাদিক জেরেমি বোয়েন তার প্রতিবেদনে ইরান চুক্তির মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন।
বোয়েনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যে স্থিতিশীলতার দ্বীপ হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ আরব রাজতন্ত্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের ব্যবসায়িক ও কৌশলগত অবস্থান পুনর্গঠনে বহু বছর লেগে যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব দেশের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে তাদের কূটনৈতিক নির্ভরতা বৈচিত্র্যময় করার এবং উপসাগরের ওপারে অবস্থিত প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের নতুন পথ খোঁজার কথা বলছেন। এদিকে চীনও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যয় করেও তার সামরিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে।
বোয়েন মনে করেন, শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো জটিলতা না এলে এই সমঝোতা এমন একটি যুদ্ধের অবসান ঘটাবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের প্রতিপক্ষ তেহরানের শক্তিকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিল।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে পুনরায় উন্মুক্ত হবে হরমুজ প্রণালি, যা বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং বিশ্বজুড়ে শত শত কোটি মানুষের জীবনের ওপর চাপ কমাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে মারা গেছেন হাজারো মানুষ। ধ্বংস হয়েছে অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বছরের শেষ দিকে দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণের আফ্রিকান দেশগুলো এতে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে এই সমঝোতা পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নয়। আলোচকদের মতে, দুই পৃষ্ঠার ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক তৈরি হয়েছে, যদিও এর পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে তারা কতটা নিষেধাজ্ঞা-শিথিলতা পাবে।
অবশেষে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার ওপর একটি সমাপ্তির রেখা টানা হয়েছে।
বোয়েন তার প্রতিবেদনে বলেন, এখন সময়টাকে ২৭ ফেব্রুয়ারিতে ফিরিয়ে নেওয়া যাক। তখন মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল—যুদ্ধবিমান সজ্জিত করা হচ্ছিল, ক্রুদের ব্রিফিং দেওয়া হচ্ছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা হচ্ছিল।
অন্যদিকে, জেনেভা-তে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানি আলোচকরা বিশ্বাস করেছিলেন যে তারা একটি বাস্তব ও ফলপ্রসূ প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন এবং নিজেদের দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি কিছু ছাড়ও দিতে প্রস্তুত ছিলেন।
তখনও হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত ছিল। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস, পাশাপাশি আধুনিক জীবনের জন্য অপরিহার্য পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য—যেমন কৃষি সার ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরির উপকরণ—এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছিল।
বর্তমান সমঝোতা স্মারক পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরু এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার পথ তৈরি করেছে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে বিশ্ব যে অবস্থায় ছিল, পরিস্থিতি আবার সেখানেই ফিরে এসেছে।
একাধিক আকস্মিক ও বিধ্বংসী হামলার প্রথমটিতে ইসরাইল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের হত্যা করে। একই সময়ে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি স্কুলে মার্কিন হামলায় ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। বিভিন্ন তদন্তে দেখা গেছে, এতে ১৫০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, যাদের মধ্যে অন্তত ১২০ জন ছিল ১২ বছরের কম বয়সী স্কুলছাত্রী।
যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দিতে ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভিডিও বার্তায় হাজির হন। তারা ধারণা করেছিলেন, এটি হবে স্বল্পমেয়াদি, দ্রুত এবং বিজয়ী একটি অভিযান। কিন্তু সেই হিসাব ছিল সম্পূর্ণ ভুল।
তাদের বক্তব্যে তেহরানের শাসনব্যবস্থার পতনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। টিকে থাকার মধ্য দিয়ে ইরানি শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নেতৃত্বে পূর্ণমাত্রার সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ছিল তেহরানের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা। সেই চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বেঁচে যাওয়া ক্ষমতাধর নেতারা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন।
খামেনি ও তার উপদেষ্টাদের দ্রুতই প্রতিস্থাপন করা হয়। তার ছেলে মোজতবা নতুন সর্বোচ্চ নেতা হন এবং নেতৃত্বে আসে অপেক্ষাকৃত তরুণ সামরিক কমান্ডারদের একটি প্রজন্ম, যাদের মধ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড-এর প্রভাব ছিল প্রবল।
তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা, ইরানের আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা, মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনার কৌশল সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রয়োগ করে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ-এর দাবি ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীকে কার্যত অচল করে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই দাবি অতিরঞ্জিত ও ভুল প্রমাণিত হয়।
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সহযোগী ছিল ইসরাইল। কিন্তু সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা তেল আবিবে গভীর হতাশার সৃষ্টি করেছে।
নেতানিয়াহু ২৮ ফেব্রুয়ারি বলেছিলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করার সুযোগের জন্য তিনি সারা রাজনৈতিক জীবন অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু এখন তিনি ইসরাইলের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
অক্টোবরে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে এই যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি সামাল দিতে হবে।
আরেকটি বড় জটিলতা হলো দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে রাখার বিষয়ে ইসরাইলের অবস্থান। ওই অঞ্চল থেকে বেসামরিক জনগণকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং হাজার হাজার স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় দখল করা ভূখণ্ড তারা অনির্দিষ্টকাল ধরে রাখবে।
নেতানিয়াহুর ওপর তার মন্ত্রিসভার কট্টরপন্থী সদস্য ও রাজনৈতিক মিত্রদের চাপ রয়েছে, যাতে তিনি লেবাননে আরও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। কেউ কেউ দক্ষিণ লেবাননকে ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত করারও দাবি তুলছেন।
রোববার বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরাইলি বিমান হামলাকে অনেকেই চলমান আলোচনাকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু উল্টোভাবে সেটি আলোচনা দ্রুততর করতেই ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হচ্ছে।
এখন অন্তত কিছুটা স্বস্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এই সমঝোতা স্মারক শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে একটি বৃহত্তর ঐতিহাসিক সমঝোতায় রূপ নেবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। কারণ আদর্শগত বিরোধ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো গভীর। সব মিলিয়ে এটি সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই একটি দুঃখজনক অধ্যায়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


