হুথিদের দখলে বাব আল-মান্দেব, সৌদির অনুরোধ সত্ত্বেও দূরে যুক্তরাষ্ট্র

হুথিদের দখলে বাব আল-মান্দেব, সৌদির অনুরোধ সত্ত্বেও দূরে যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: সংগৃহীত

ইরানের মিত্র হুথিদের হাতে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা চলে গেছে। কৌশলগত দ্বীপ ও লোহিত সাগরের দীর্ঘ উপকূলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাবেও নিয়ন্ত্রণ শক্ত করেছে গোষ্ঠীটি। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহান্তে মাসকাটে মার্কিন দূতাবাসে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। বৈঠকে হুথিরা আশ্বস্ত করেছে, লোহিত সাগরে তারা মার্কিন জাহাজে হামলা করবে না। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

হুথিদের এমন আশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন আছে। অতীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে গোষ্ঠীটি। তাদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানও রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া ছাড়া ওয়াশিংটনের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই।

সৌদি আরবের চাপ

হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চাপ দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। গত সপ্তাহে তিনি ট্রাম্পকে দুবার ফোন করে হামলার অনুরোধ করেন বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এরপর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জরুরি সমন্বয়ের জন্য রিয়াদ যান। এতে বোঝা যায়, সৌদিকে সমর্থন করলেও সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র।

ইসরাইলও সৌদির হয়ে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে বলে খবর এসেছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইসরাইল সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা কম। গাজা, লেবানন, সিরিয়া, পশ্চিম তীর ও ইরান নিয়ে একসঙ্গে চাপ সামলাতে হচ্ছে দেশটিকে। এর মধ্যে ইয়েমেন নতুন আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে।

ওয়াশিংটনের ওপর সৌদির আস্থা কমছে

ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের অনাগ্রহ সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। গত কয়েক বছর ধরেই রিয়াদ বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে।

২০১৮ ও ২০১৯ সালে সৌদির তেল স্থাপনায় হামলার পর সম্পর্ক বহুমুখী করার উদ্যোগ নেয় দেশটি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সৌদি। পরে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও বাড়ানো হয়।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নয়। বরং নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব আরো বহুমুখী করার চেষ্টা।

ইরান যুদ্ধেই চাপে যুক্তরাষ্ট্র

ইয়েমেনে সরাসরি না জড়ানোর বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ইরান যুদ্ধ। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের শেষ কোথায়, তা স্পষ্ট নয়। এরই মধ্যে তেল ও যুদ্ধের খরচ বেড়েছে।

পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম চার মাসেই খরচ হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২২ বিলিয়ন ডলার গেছে গোলাবারুদে। অসংখ্য মার্কিন বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অস্ত্রভান্ডারে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার খবরও এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য বলছে, তাদের হাতে এখনো বিপুল অস্ত্র রয়েছে।

এর মধ্যে ইয়েমেনে নতুন যুদ্ধ শুরু হলে সামরিক চাপ আরো বাড়বে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। ট্রাম্প নিজেই দীর্ঘস্থায়ী ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বাব আল-মান্দাবে চাপে কারা?

হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাব—দুটি নৌপথই এখন ঝুঁকিতে। হরমুজ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে যায়। আর বাব আল-মান্দাব এশিয়া ও চীনের বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, বাব আল-মান্দাব দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে চীনের ওপর চাপ বেশি পড়তে পারে। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রও রেহাই পাবে না। সৌদি অবকাঠামো ও জাহাজে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাড়বে পরিবহন ও জ্বালানির খরচ, যার প্রভাব পড়বে মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও।

অধ্যাপক মাবনের মতে, হুথিদের বাব আল-মান্দাব নিয়ন্ত্রণে থাকতে দেওয়া চীনকে দুর্বল করা বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা নয়। ইরান যুদ্ধেই চাপে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এখন ইয়েমেনে নতুন যুদ্ধের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...