বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্যের দ্রুত পতন ঠেকাতে খাদ্য উৎপাদন ও ভোগের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডব্লিউডব্লিউএফ)। সংস্থাটির নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যপ্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে এবং এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা শুধু পরিবেশ নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ডব্লিউডব্লিউএফের ২০২৬ সালের ‘লিভিং প্ল্যানেট রিপোর্ট’ অনুযায়ী, ১৯৭০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করা বন্য মেরুদণ্ডী প্রাণীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর গড় আকার ৭৩ শতাংশ কমেছে। ৫ হাজার ৭৯০টি মেরুদণ্ডী প্রজাতির ৩৫ হাজার ৮০৩টি জনগোষ্ঠীর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃতির ওপর চাপ কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে। সেখানে ১৯৭০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে স্থল ও মিঠাপানির বন্যপ্রাণীর জনগোষ্ঠীর গড় আকার ৯৫ শতাংশ কমেছে। আফ্রিকায় এই পতন ৮০ শতাংশ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ৪৯ শতাংশ। ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় কমেছে ২৩ শতাংশ। উত্তর আমেরিকায় পতনের হার ২৮ শতাংশ।
বাস্তুতন্ত্রের দিক থেকেও মিঠাপানির প্রাণীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। নদী ও হ্রদের প্রাণীদের পর্যবেক্ষণ করা জনগোষ্ঠীর গড় আকার ৮৫ শতাংশ কমেছে। স্থলভাগের প্রাণীর ক্ষেত্রে এই পতন ৬৯ শতাংশ এবং সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষেত্রে ৫৯ শতাংশ।
ডব্লিউডব্লিউএফ বলছে, জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হচ্ছে খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি সম্প্রসারণের কারণে আবাসস্থল ধ্বংস ও অবক্ষয়। এর সঙ্গে অতিরিক্ত শিকার ও আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, আগ্রাসী প্রজাতি এবং বিভিন্ন রোগও প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। সংস্থাটির মতে, বিশ্ব যেভাবে খাদ্য উৎপাদন ও ভোগ করছে, সেটিই জীববৈচিত্র্য হ্রাসের একক সবচেয়ে বড় কারণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃতির ক্ষতি এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়। এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক বা প্রায় ৫৮ ট্রিলিয়ন ডলারের কার্যক্রম কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতি ও এর সেবা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রজাতি ও বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক পতন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং মানুষের কল্যাণের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ডব্লিউডব্লিউএফের যুক্তরাজ্য শাখার প্রধান নির্বাহী তানিয়া স্টিল বলেন, প্রকৃতির ক্ষতি শুধু বন্যপ্রাণীর জন্য সংকট নয়; এর প্রভাব ইতোমধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা, পানির সরবরাহ, অর্থনীতি এবং জলবায়ুজনিত ধাক্কা মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর পড়ছে। তার মতে, বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে প্রকৃতির ক্ষতির ক্রমবর্ধমান মূল্য দিতে থাকবে, অথবা প্রকৃতির পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ করে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে শুধু সংকটের চিত্রই তুলে ধরা হয়নি, কিছু আশার দিকও দেখানো হয়েছে। বন্য বাঘ, সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ ও বিভিন্ন প্রজাতির টুনার সংখ্যা পুনরুদ্ধারের উদাহরণ দিয়ে ডব্লিউডব্লিউএফ বলছে, কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রকৃতির ক্ষয় উল্টে দেওয়া সম্ভব। ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে বন্য বাঘের সংখ্যা ৩ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ হয়েছে, অর্থাৎ ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রকৃতিবান্ধব কৃষি, খাদ্য অপচয় কমানো এবং বন ও আবাসস্থল ধ্বংস বন্ধ করার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বড় কোম্পানিগুলোকে জলবায়ু ও প্রকৃতি রক্ষার বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা নিতে হবে এবং বিনিয়োগকে এমন কর্মকাণ্ডে পরিচালিত করতে হবে, যা প্রকৃতি ধ্বংসের পরিবর্তে পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
ডব্লিউডব্লিউএফের মতে, প্রকৃতির ক্ষয় অনিবার্য নয়। সঠিক নীতি, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং সরকার, ব্যবসা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বন্যপ্রাণী ও বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার সম্ভব। এখন খাদ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একই ধরনের পরিবর্তন আনা গেলে বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য বিপর্যয়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও ডব্লিউডব্লিউএফ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


