ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে দেশটির বিরোধী দলগুলো ও তরুণদের একটি অংশ। আন্দোলনে এখন সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে একটি স্লোগান—‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো’। তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই স্লোগান এখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এমন আন্দোলনকে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন।
গতকাল বুধবার দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বামপন্থি নেত্রী নেহা বোরা বলেন, ‘১৩ কোটি মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করা দেশের সবচেয়ে গুরুতর ইস্যু।’
২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে সিজেপির সমাবেশে বিপুল মানুষের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে মানুষের দাবির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে ককরোচ জনতা পার্টি, বামপন্থি দল ও বিভিন্ন সংগঠন জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। বুধবার দিল্লি থেকে আন্দোলন আরো জোরদার করার ডাক দেন নেহা বোরা। তিনি বামপন্থি ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি।
একই সঙ্গে বিরোধীদের ইন্ডিয়া জোটের দলগুলোও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে।
বিতর্কের শুরু যেভাবে
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর আপত্তি সত্ত্বেও জ্ঞানেশ কুমার কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এসব সিদ্ধান্তের বেশির ভাগই ছিল ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-সংক্রান্ত।
নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্য সমমর্যাদায় মতবিনিময়ের পর সংখ্যাগরিষ্ঠতা বা সর্বসম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন। বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআর-সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
এই অভিযোগের পর থেকেই জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধী দলগুলো।
রাহুল গান্ধীর অবস্থান
৬ অক্টোবর কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করার দাবিতে দিল্লিতে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিরোধী জোটের অন্য নেতারাও। তারা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিও জানান।
পুলিশ রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন বিরোধী নেতাকে আটক করে। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরদিন ৭ অক্টোবরও রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় আটক হন।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগের জবাব দিতে হবে। বিরোধীদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন বলেছে, বিক্ষোভরত সাংসদদের কাছ থেকে স্মারকলিপি নিতে তারা একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের দাবিতে অনড় ছিলেন।
বিজেপি এই আন্দোলনের সমালোচনা করেছে। দলটির নেতা সুধাংশু ত্রিবেদী বলেছেন, বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলতে আদৌ আগ্রহী কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরাসরি তলব করাকে তিনি সংবিধানবিরোধী বলেছেন।
তরুণেরা কেন যুক্ত হলো
শুরুতে এই ইস্যুতে তরুণদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের একটি সমাবেশের পর।
ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দীপকে ওই সমাবেশে তরুণদের ভাষায় স্লোগান দেন, ‘জ্ঞানেশ, ইটস ডান ব্রো।’ অর্থাৎ, ‘জ্ঞানেশ, তোমার খেলা শেষ ভাই।’ স্লোগানটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সমাবেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ অংশ নেন।
অভিজিৎ দীপকের তরুণদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা এর আগেও দেখা গেছে। জুলাইয়ে সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা নিটে কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।
মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কের সমাবেশে তিনি জ্ঞানেশ কুমারকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এক গরিব মায়ের সন্তান। আপনার কারণে সব সন্তানই গরিব মায়ের সন্তান হয়ে গেছে।’
এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগকে তরুণদের শিক্ষা, চাকরি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত করেন তিনি।
সাবেক আমলা জহর সরকার বিবিসি নিউজ বাংলাকে বলেন, ২৫ বছর বয়সি একজন তরুণ ১২ বছর বয়স থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি শুনে বড় হয়েছে। কিন্তু বড় হয়ে সে স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়নি বলে দেখতে পাচ্ছে।
তার মতে, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধেও তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন নিয়ে সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল কেন
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে পুরোনো বিতর্ক।
ভারতের নির্বাচন কমিশন গঠিত হয় ১৯৫০ সালে। তখন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির হাতে ছিল।
২০২৩ সালের মার্চে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ ‘অনুপ বারানওয়াল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ মামলায় নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা ও প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে একটি প্যানেলের কথা বলেছিল।
তবে একই বছর সংসদে পাস হওয়া একটি আইনে নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী, একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধিকে নিয়ে নিয়োগ কমিটি গঠন করা হয়।
বিরোধীদের অভিযোগ, এতে কমিটিতে সরকারের প্রতিনিধিত্ব দুইজন হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব বেড়েছে।
এ নিয়েই সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। ৬ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের মন্তব্যের পর বিতর্ক আরও বেড়েছে।
ফর্ম-৬ নিয়ে নতুন বিতর্ক
ভোটার হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ফর্ম-৬ নিয়েও নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এসআইআর প্রক্রিয়ার সঙ্গে ফর্ম-৬ যুক্ত করে এতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত ফর্মে নতুন ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁদের বা তাঁদের বাবা-মায়ের নাম আগের এসআইআরের পর তৈরি ভোটার তালিকায় ছিল কি না।
২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসআইআরের আগে সর্বশেষ এসআইআর হয়েছিল ২০০২ সালে। ফলে আগের তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিদের নতুন করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন এক প্রেস নোটে বলেছিল, এসআইআরের জন্য ফর্ম-৬-এর সঙ্গে যুক্ত ঘোষণাপত্রটি সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে।
কিন্তু ৫ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট করে বলেন, সংশোধিত ফর্ম-৬ সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন করেনি।
এ বক্তব্যের পর ২৬ সেপ্টেম্বরের নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
কেন তরুণদের ক্ষোভ বাড়ছে
জুলাইয়ে ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে নিট পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানেও তরুণেরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন সামনে এনেছিলেন।
নেহা বোরা বলেন, তরুণেরা মনে করছেন বিভাজনের রাজনীতির কারণে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বিষয়ও মূল আলোচনার বাইরে চলে যাচ্ছে।
তার মতে, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জবাবদিহি আদায়ের একটি নতুন প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সঞ্জীব শ্রীবাস্তব বিবিসি নিউজ হিন্দিকে বলেন, ভারতের তরুণদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে। তাঁদের আগের মতো পরিস্থিতি মেনে নিয়ে বসে থাকার প্রবণতা কমছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরথের মতে, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণ এমন পরিবারের সন্তান, যারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে।
তার ভাষ্য, শিক্ষা, চাকরি ও বেকারত্বের মতো বিষয় এখন তাঁদের জীবনের সরাসরি সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আন্দোলনে নারীদের বড় অংশগ্রহণও সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। কারণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের মতো বিষয় নারী-পুরুষ, জাতি ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার জীবনকে প্রভাবিত করে।
এর প্রভাব ভারতীয় রাজনীতিতে কতটা
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে তরুণদের আন্দোলনে ব্যবহৃত স্লোগান এখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও ব্যবহার করছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, তরুণদের আন্দোলন রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতেও প্রভাব ফেলছে।
এর আগে শিক্ষা ও পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে তরুণদের আন্দোলনের পর তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় সরকারের অন্য মন্ত্রীরাও তরুণদের কাছে পৌঁছাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হন। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও জেন-জি প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে কয়েকটি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন।
তবে আরতি জেরথের মতে, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মতো বড় প্রশ্নের সমাধান না হলে শুধু যোগাযোগের কৌশল দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।
আগামী বছর ভারতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন রয়েছে। এর মধ্যে উত্তর প্রদেশের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। জেরথের মতে, বিজেপি ও বিরোধী শিবিরের অবস্থান কতটা বদলেছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হবে এসব নির্বাচন।
তবে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নির্বাচনের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

