হুথিদের চাপে কোণঠাসা সৌদি আরব

হুথিদের চাপে কোণঠাসা সৌদি আরব
ছবি: এপি

ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি এবং সৌদি আরবে ধারাবাহিক হামলা রিয়াদকে বড় এক সংকটে ফেলেছে। হুথিদের ঠেকাতে এখন সৌদি আরবের সামনে যে পথগুলো আছে, প্রতিটির সঙ্গেই বড় ঝুঁকি। সামরিকভাবে জবাব দিলে ছড়িয়ে পড়তে পারে বড় যুদ্ধ। আর রাজনৈতিক সমাধানের পথও প্রায় শেষ। ফলে ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে উপসাগরীয় দেশটি।

বিজ্ঞাপন

ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ঝুঁকি পরামর্শক মোহাম্মদ আল-বাশা বলেন, সবকিছু এখন বড় ধরনের সৌদি পাল্টা হামলার দিকেই ইঙ্গিত করছে। প্রতিদিনই সেই সম্ভাবনা বাড়ছে।

তার ভাষায়, ‘এই মুহূর্তে তাদের কোনো বিকল্প নেই।’

চলতি সপ্তাহে হুথিরা লোহিত সাগরের মুখে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখল করেছে। একই সঙ্গে তারা বন্দর শহর মোচার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে তারা। এই প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।

এর পরপরই সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা হয়। পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যায়। ইরাক থেকে ড্রোন হামলা চালানো হলেও কোনো পক্ষ এর দায় স্বীকার করেনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করেছেন। ইরাকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়।

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব এই পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব তেল পারস্য উপসাগরে অপেক্ষমাণ ট্যাংকারে যাওয়ার কথা ছিল।

গত মাসের শুরুতেই এমন হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল সৌদি আরব। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তখন সিএনএনকে বলেছিলেন, ইরান-সমর্থিত হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়াদের সমন্বিত একাধিক হামলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে রিয়াদ।

শক্তিশালী সৌদি, তবু হুথিদের ঠেকানো কঠিন

সামরিক শক্তির হিসাবে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে বড় ব্যবধান। একদিকে বিপুল সম্পদের অধিকারী সৌদি আরব। তাদের রয়েছে আধুনিক ও সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে দরিদ্র ইয়েমেনের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি। কিন্তু বাস্তবে এই গোষ্ঠীকে পরাজিত করা সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।

পশ্চিমা দেশ ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে হুথিদের ইরানের প্রক্সি হিসেবে দেখা হয়। একসময় তাদের অগোছালো মিলিশিয়া হিসেবেও বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তারা সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধকৌশল বাড়িয়েছে।

গাজা যুদ্ধের পর ইসরাইলে হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশে নিজেদের জনপ্রিয়তাও বাড়িয়েছে হুথিরা। ওই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল হামাসের নেতৃত্বে ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামলার পর।

হুথিদের মূল দাবিও বদলায়নি। উত্তর ইয়েমেনের বিশাল এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে। ওই অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন রাখতে সৌদি আরব যে ভ্রমণ ও অর্থনৈতিক অবরোধ চালিয়ে আসছে, তা তুলে নেওয়ার দাবি তাদের।

হুথিরা ইরানের মিত্র হলেও তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও এজেন্ডা রয়েছে। হুথি-নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সাবার প্রধান নাসর আল-দীন আমের শুক্রবার সিএনএনকে বলেন, সৌদি আরবের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে তারা। ১২ বছরের ‘অন্যায় অবরোধ’ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত এই চাপ চলবে বলে জানান তিনি।

অর্থাৎ সংঘাত কমানোর বদলে আরো বাড়ানোর পথেই এগোচ্ছে হুথিরা।

পাল্টা হামলা মানেই বড় যুদ্ধের ঝুঁকি

ইয়েমেনের সংঘাত শুরু হয় ২০১৪ সালে। ওই বছর হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। পরের বছর বিদ্রোহীদের হটাতে সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব।

এরপর থেকে সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করে আসছে। একই সঙ্গে হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর ওপর কঠোর অবরোধ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে ইরান হুথিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা প্রভাব রাখে।

নিজেদের ভূখণ্ডগত ক্ষতি সত্ত্বেও সৌদি আরব এখনো পূর্ণ শক্তিতে পাল্টা হামলা চালায়নি। কিন্তু হুথিদের অগ্রগতি রিয়াদকে সেই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভিজিটিং ফেলো সিনজিয়া বিয়াঙ্কো বলেন, হুথিদের সঙ্গে সংঘাতে সৌদি আরবের বিকল্প খুবই কম।

তার মতে, রিয়াদ চাইলে সামরিক অভিযান জোরদার করতে পারে। কিন্তু তাতে বড় মূল্য দিতে হবে। সৌদি আরব যদি ‘সব শক্তি দিয়ে’ যুদ্ধে নামে, তাহলে তা ইয়েমেনের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হতে পারে।

ইয়েমেনের ওই যুদ্ধ ইতোমধ্যে দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত করেছে। প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, এখন মানবিক সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে।

নতুন করে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলে ইরানও এতে জড়িয়ে পড়তে পারে। আর তাতে ইয়েমেনের সংঘাত আর ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

বিয়াঙ্কো বলেন, তখন এটি বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের একটি অধ্যায়ে পরিণত হতে পারে। সৌদি আরবও সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধে নামা একটি পক্ষ হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি যুদ্ধে যেতে চাইছে না

হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবকে সামরিকভাবে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র কতটা এগোবে, সেটিও বড় প্রশ্ন।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বিতর্কের কারণে ওয়াশিংটন সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না।

বিয়াঙ্কো বলেন, রাজনৈতিকভাবে এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি আরো বাড়ানোর অবস্থায় নেই ট্রাম্প প্রশাসন। পর্দার আড়ালে সৌদি আরবের সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের চাপও যুক্তরাষ্ট্র প্রতিহত করছে।

শনিবার ট্রাম্প বলেন, হুথিরা তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তারা চায় না যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই সংঘাতে জড়াক।

ট্রাম্পের ভাষায়, হুথিরা যুক্তরাষ্ট্রকে না জড়ানোই বেশি পছন্দ করবে। তারা বেশির ভাগ জাহাজকে চলাচলের সুযোগও দিচ্ছে। তবে একটি দেশের বিষয়ে তারা সন্তুষ্ট নয় এবং সেটি যুক্তরাষ্ট্র সমাধান করবে।

সিএনএনকে একটি সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সৌদি যুবরাজ ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার কথা বলেন। লোহিত সাগরের দিকে হুথিদের অগ্রযাত্রার মধ্যে তাদের ওপর হামলা চালানোর আহ্বান জানান তিনি। তবে ট্রাম্প তাতে রাজি হননি।

তবে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি দূরে সরে যায়নি। হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে গোয়েন্দা সহায়তা দিতে প্রায় ১০০ সামরিক পরামর্শক পাঠিয়েছে তারা বলে একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে সিএনএন।

কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধ অধ্যয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ ফেলো ও সৌদি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নওয়াফ ওবায়েদ বলেন, সৌদি আরবের অনুরোধ কখনোই মার্কিন বিমান হামলার জন্য ছিল না। তাদের চাওয়া ছিল গোয়েন্দা সহায়তা। তবে এখন পর্যন্ত সেই সহায়তা সীমিত।

রাজনৈতিক সমাধানের পথও প্রায় বন্ধ

সামরিক সংঘাত বাড়ানো ছাড়াও সৌদি আরবের সামনে রাজনৈতিক সমঝোতার পথ রয়েছে। কিন্তু সেই পথও এখন প্রায় বন্ধ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত কয়েক মাসে রিয়াদ ‘কৌশলগত ধৈর্য’ দেখিয়েছে বলে জানান বিয়াঙ্কো। হুথি ও ইরান—দুই পক্ষকেই বারবার সতর্ক করেছে সৌদি আরব। নিন্দাও জানিয়েছে। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি।

পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার পর সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ পর্যায়ে তারা পাল্টা জবাব না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যে দেশ থেকে হামলা হয়েছে, সেই ইরাক সরকারের প্রচেষ্টাকেও সমর্থন করছে তারা। তবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করে।

বিয়াঙ্কোর মতে, রাজনৈতিক সমাধানের পথগুলো সৌদি আরব ‘শেষ করে ফেলেছে’।

হুথিদের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলেও সৌদি আরবকে বড় মূল্য দিতে হবে বলে মনে করেন আল-বাশা। তার মতে, এর অর্থ হবে হুথিদের দাবির কাছে পুরোপুরি নতি স্বীকার করা। তিনি একে কার্যত ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

এখন কী করবে রিয়াদ?

সৌদি আরব কবে পরবর্তী পাল্টা পদক্ষেপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেন সরকারের বাহিনী ইতোমধ্যে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সৌদি ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক সালমান আল-আনসারি।

তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিন, এমনকি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে তীব্র হতে পারে। একাধিক ফ্রন্টে বড় ধরনের চমকও দেখা যেতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিকভাবে দৃঢ়, দীর্ঘস্থায়ী ও স্পষ্ট সমর্থন ছাড়া সৌদি আরব সর্বাত্মক যুদ্ধে যাবে না বলে মনে করেন আল-আনসারি।

তার মতে, হুথিদের বিষয়ে সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের অতীত সতর্কবার্তাগুলো আমলে না নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গুরুতর ভুল করেছে। এখন রিয়াদ আশা করছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে এবং হুথিদের হাত থেকে ইয়েমেনকে মুক্ত করতে পূর্ণ সমর্থন দেবে।

তবে অন্য বিশ্লেষকেরা মনে করেন, হুথিরা যদি সংঘাত আরো বাড়াতে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক সমর্থন থাকুক বা না থাকুক, সৌদি আরবকে যুদ্ধে যেতে হবে।

আল-বাশার ভাষায়, ‘সৌদিরা হুথি ও ইরাকি ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স—দুই পক্ষের কাছ থেকেই হামলার শিকার হচ্ছে। তাদের কোনো বিকল্প নেই।’

তিনি বলেন, ‘আমি তাদের অবস্থানে থাকতে চাইতাম না।’

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন