ইরানের পরমাণু স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা

ইরানের পরমাণু স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর মার্কিন হামলাকে ‘অসাধারণ সামরিক সাফল্য’ হিসেবে প্রচার করেছেন। এরপর তিনি দাবি করেন, দেশটির পারমাণবিক স্থাপনা ‘সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস’ করা হয়েছে। তবে পশ্চিমা সামরিক সূত্রগুলো সিএনএনকে জানিয়েছে ভিন্নকথা। তারা বলছে, এখনই ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ মূল্যায়ন করা যাচ্ছে না।

তবে বাণিজ্যিক কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনাটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সম্ভবত ধ্বংস হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের সাবেক পারমাণবিক পরিদর্শক ও ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রধান ডেভিড অলব্রাইট বলেন, স্থাপনাটি সম্ভবত একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেছে।

তবে সিএনএনএ করপোরেশনের সহযোগী গবেষক ও কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি বিশেষজ্ঞ ডেকার ইভেলেথ রয়টার্সকে বলেন, ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটি ধ্বংস হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি। শত শত সেন্ট্রিফিউজ থাকা হলটি এতটাই গভীরে অবস্থিত যে, কৃত্রিম উপগ্রহের ছবির ভিত্তিতে এর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এদিকে ট্রাম্পের দাবি যদি সঠিকও হয়, তবুও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংসের অর্থ দেশটির পারমাণবিক হুমকির অবসান নাও হতে পারে।

বছরের পর বছর ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থিরা আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আহ্বান জানিয়ে আসছে। যদিও ইরানের দাবি, তার পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তবুও এই আহ্বানগুলো অনিবার্যভাবেই দিন দিন আরো বাড়তে থাকবে। শুধু তা-ই নয়, এই কট্টরপন্থিরা একসময় হয়তো সফল হবে।

আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, ইরানি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই চুক্তি বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

ইস্তানবুলে এক সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, এনপিটি আমাদের রক্ষা করতে সক্ষম নয়। তাহলে ইরান বা অন্য দেশ যারা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক শক্তি অর্জনে আগ্রহী, তারা কেন এনপিটির ওপর নির্ভর করবে।

অন্যান্য ইরানি আইন প্রণেতাও ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন, যা সম্ভবত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ইরানি অভিপ্রায় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হবে।

তবে একটি বিষয় সত্য আর সেটি হচ্ছেÑলক্ষ্য ও সক্ষমতা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। মার্কিন হামলার পরপরই পারমাণবিক সক্ষমতা ইরানের জন্য একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রগুলো দেখে বোঝা যায়, এক ডজনেরও বেশি বাঙ্কার বাস্টার বোমা হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস না হলেও কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দৃঢ়তা থাকলে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো মেরামত বা পুনর্নির্মাণ করা যেতে পারে।

এদিকে জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান ইতোমধ্যে যে পারমাণবিক উপকরণ তৈরি করেছে, তার অবস্থান সম্পর্কে তারা জানেন না। যার মধ্যে রয়েছে ৬০ ভাগ পর্যন্ত সমৃদ্ধ বিপুল পরিমাণে ইউরেনিয়াম-২৩৫, যা বোমা তৈরির গ্রেডের খুব কাছাকাছি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগেই তিনটি পারমাণবিক স্থাপনা— ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান খালি করা হয়েছিল। যার ফলে এই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে যে, এই উপকরণের কিছু বা পুরোটাই অন্য কোথাও, সম্ভবত কোনো গোপন স্থাপনায় সংরক্ষণ করা হচ্ছেÑযা পারমাণবিক পরিদর্শকদের অজানা।

এই বিপজ্জনক পারমাণবিক অনিশ্চয়তার জন্য ট্রাম্প দরকষাকষি করেছেন বলে মনে হচ্ছে না। তিনি বলেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দাঙ্গাবাজ। এখন তাকে শান্তি স্থাপন করতে হবে।

কিন্তু সমগ্র অঞ্চল এখন ইরানের আরো প্রতিশোধমূলক হামলার শঙ্কার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরাইল, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথ। ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠা দূরবর্তী বলেই মনে হচ্ছে।

জেনেভায় ইউরোপীয় ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে গত শুক্রবারের সংক্ষিপ্ত বৈঠকের কথা উল্লেখ করে একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক সিএনএনকে জোর দিয়ে বলেন, ইরানের সঙ্গে আমাদের আলোচনা ছিল একটি বাস্তব সুযোগ। কিন্তু আমেরিকানরা সে সুযোগ ভণ্ডুল করে দিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন