এক যুগেও শেষ হয়নি ফেনীর একরাম হত্যা মামলার বিচার

এক যুগেও শেষ হয়নি ফেনীর একরাম হত্যা মামলার বিচার

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম হত্যার এক যুগ পেরিয়ে গেছে। ২০১৪ সালের ২০ মে সংঘটিত দেশের অন্যতম আলোচিত ও নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিভীষিকা এখনো ভুলতে পারেননি ফেনীবাসী। প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে, গুলি করে এবং পরে গাড়িসহ আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল জনপ্রিয় এই জনপ্রতিনিধিকে।

এক যুগ পার হলেও সেই মামলার মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের শুনানি এখনো উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি। অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৩৯ আসামির মধ্যে ১৬ জন এখনো পলাতক।

বিজ্ঞাপন

যেভাবে হত্যা করা হয় একরামকে

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ২০ মে দুপুরে ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ার বাসা থেকে ডায়াবেটিক হাসপাতাল ঘুরে সেখান থেকে উপজেলা পরিষদে যাচ্ছিলেন ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক একরাম। বেলা প্রায় ১১টার দিকে শহরের একাডেমি সড়কের বিলাসী সিনেমা হলসংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে একটি অটোরিকশা দিয়ে তাকে বহনকারী সাদা প্রাইভেট কারের গতিরোধ করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর সশস্ত্র হামলাকারীরা গাড়িটি ঘিরে ফেলে।

চালকসহ গাড়িতে থাকা অন্য চারজন প্রাণ বাঁচাতে বেরিয়ে এলেও একরাম বের হতে পারেননি। হামলাকারীরা গাড়ির ভেতরেই তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে এবং একাধিক গুলি করে। পরে পেট্রল ঢেলে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার ভিডিও সেসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

মামলা ও অভিযোগপত্র

হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের বড় ভাই জসিম উদ্দিন বাদী হয়ে ফুলগাজী উপজেলা বিএনপির নেতা ও উপজেলা নির্বাচনে একরামের প্রতিদ্বন্দ্বী মাহতাব উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মিনারের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৩৩ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

তদন্ত শেষে একই বছরের ৩০ আগস্ট তৎকালীন ফেনী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ ৫৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তদন্ত চলাকালে সোহেল নামে এক আসামি র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড

ঘটনার চার বছর পর ২০১৮ সালের ১৩ মার্চ ফেনীর তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ আমিনুল হক আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অপরদিকে, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বিএনপি নেতা মাহতাব উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী মিনার, আওয়ামী লীগ নেতা বেলাল ওরফে টুপি বেলাল, যুবলীগ নেতা জিয়াউল আলম মিস্টারসহ ১৬ জন খালাস পান।

রায়ে দণ্ডিতদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং তৎকালীন ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নিহত একরাম নিজেও সে সময় ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।

পলাতক ১৬ আসামি

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জন এখনো পলাতক। তারা হলেন— তারা হলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদ হোসেন, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লায়লা জেসমিন বড় মনির ছেলে ও ফেনী-২ আসনের পলাতক সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারীর মামাতো ভাই আবিদুল ইসলাম, আরমান হোসেন, চৌধুরী মো: নাফিজ উদ্দিন, জাহেদুল হাসেম, এমরান হোসেন, রাহাত মো: এরফান, জসিম উদ্দিন, একরাম হোসেন ওরফে আকরাম, শফিকুর রহমান, কফিল উদ্দিন মাহমুদ, মোসলে উদ্দিন, ইসমাইল হোসেন, মহিউদ্দিন আনিছ, বাবলু ও টিটু। তাদের মধ্যে আটজন বিচার চলাকালে জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে যান। অপর আটজন শুরু থেকেই অধরা।

পলাতক আসামিদের বিষয়ে ফেনী মডেল থানার ওসি গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজীম বলেন, একরাম হত্যাকাণ্ড মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ সব সময় সচেষ্ট রয়েছে। তাদের সন্ধান পেলেই গ্রেপ্তার করা হবে।

উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে ডেথ রেফারেন্স

এদিকে ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) বিরুদ্ধে আসামিদের আপিলের শুনানি উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। ২০২৪ সালের মে মাসে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে একরাম হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স শুনানি কার্যতালিকাভুক্ত হয়েছিল। বিচারপতি হাবিবুল গনি ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে ওই বছরের জুন মাসের শেষের দিকে মামলাটি শুনানির জন্য ধার্য ছিল। তবে কিছুদিন পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরকার পতনের পর বেঞ্চটি ভেঙে যায়।

পরে ২০২৫ সালে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরীন আক্তারের সমন্বয়ে নতুন বেঞ্চ গঠন করা হলেও নির্ধারিত সময়েও শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি বলে জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী।

কারাগারে আছেন যারা

এ মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে কনডেম সেলে আছেন হত্যার পরিকল্পনাকারী জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেল, ফেনী পৌরসভার তৎকালীন কাউন্সিলর আবদুল্লাহিল মাহমুদ শিবলু, সাজ্জাদুল ইসলাম পাটোয়ারী ওরফে সিফাত, আবু বক্কার সিদ্দিক, আজমির হোসেন রায়হান, শাহজালাল উদ্দিন, জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, কাজী শানান মাহমুদ, মীর হোসেন আরিফ, আরিফ, রাশেদুল ইসলাম, সোহান চৌধুরী, জসিম উদ্দিন, নিজাম উদ্দিন আবু, আবদুল কাইউম, নুর উদ্দিন মিয়া, তোতা মানিক, জিয়াউর রহমান বাপ্পি, মো. সজীব, মামুন, রুবেল, হুমায়ুন ও টিপু। তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান বাপ্পিকে সর্বশেষ ২০২১ সালের ১২ নভেম্বর গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ফেনী জেলা কারাগারের জেল সুপার আবদুল জলিল জানান, একরাম হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাতজন বর্তমানে ফেনী জেলা কারাগারে রয়েছেন। অন্যরা কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন কারাগারে আছেন।

স্বজনদের আতঙ্ক ও হতাশা

এদিকে হত্যার এক যুগ অতিবাহিত হলেও অজানা আতঙ্কে এখন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান না একরামের স্বজনেরা। পরিবারের একটি সূত্র জানায়, নিহত একরামের স্ত্রী ও তিন সন্তান ঘটনার পর থেকে ঢাকায় অবস্থান করছেন।

নিহতের বড় ভাই মোজাম্মেল হক বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। রায় কার্যকরে বর্তমান সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে ন্যায়বিচার থমকে যাবে। একরামের তিন সন্তান এখন পড়াশোনা করছে। তারা যেন তাদের বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসির দেখতে পারে, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন