টানা দুই সপ্তাহের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, পাহাড়ধসে প্রাণহানি ও চরম দুর্ভোগের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার ১৫-১৬টি উপজেলায় সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। পানি ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ধ্বংসের প্রকৃত চিত্র। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফসলিজমি, মাছের ঘের ও গবাদিপশু—সব খাতেই হয়েছে শত শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি। শিশুসহ প্রাণ গেছে অন্তত ৫৩ জনের।
চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বন্যা, পাহাড়ধস ও দেয়ালধসে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়ে ৫৩ জনে পৌঁছেছে, যার মধ্যে একাধিক শিশুও রয়েছে। শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই মারা গেছেন অন্তত ১৩ জন, যার মধ্যে ছয়জন শিশু। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা শুরুর দিকে ছিল আট লাখ ৬৭ হাজার, পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় আট লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ জনে। শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ছয় লাখ ৬২ হাজার মানুষ। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, চট্টগ্রাম মহানগরীসহ জেলার ১৬টি উপজেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার এক লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮ পরিবার ক্ষতির শিকার হয়েছে। ১৫ উপজেলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায়, যেখানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দীর্ঘদিন পানিবন্দি ছিলেন।
দুর্গতদের আশ্রয়ের জন্য জেলায় খোলা হয়েছে শত শত আশ্রয়কেন্দ্র। সূত্র মতে, ৫৮০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২২ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে অনেক কেন্দ্রে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে, বিশেষ করে দুর্গম এলাকায়। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বন্যায় চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার ২৮১টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি নামার পর দেখা যাচ্ছে ঘরের ভেতর জমে থাকা কাদা, নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র ও গৃহস্থালি সামগ্রী। বাড়িঘরে ফিরেও স্বস্তি পাচ্ছেন না দুর্গতরা—খাদ্যসংকট ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা।
সড়ক ও অবকাঠামোর ক্ষতি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থাই বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে। সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জোনে মোট ২১৩ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সব মিলিয়ে এক হাজার ৩২০ কিলোমিটার পর্যন্ত সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে, যার মধ্যে গ্রামীণ সড়কের সংখ্যাই বেশি। প্রায় দেড়শর কাছাকাছি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জেলা প্রশাসনের তথ্যে উঠে এসেছে।
অনেক এলাকায় গ্রামীণ সড়কের সিংহভাগ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, ফলে ত্রাণ পৌঁছাতে নৌকা ও সেনাবাহিনীর স্পিডবোট ব্যবহার করতে হচ্ছে। প্রায় ৩৭৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে গেছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে, যা স্কুল-কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলেছে।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধান, শাকসবজি, পানের বরজসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলায় প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন। বন্যায় প্রায় ১০ হাজার মৎস্যঘের ডুবে সব মাছ ভেসে যাওয়ায় মৎস্য খাতে অন্তত ৯১ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ—এই দুই উপখাত মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এক লাখের বেশি গবাদিপশুর মৃত্যু
প্রাণিসম্পদ খাতে হয়েছে সবচেয়ে করুণ চিত্র। চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে এক লাখ ১২ হাজার ৮২৭টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গরু ৪৫-৪৬টি। সর্বশেষ হালনাগাদে চট্টগ্রাম জেলাতেই ৩৯টি মৃত্যু। ছাগল ১২৩টি (চট্টগ্রাম জেলায় ৯৫টি)। ভেড়া ৪০-৪২টি, মুরগি এক লাখ এক হাজার থেকে এক লাখ ৪২ হাজারের বেশি ও হাঁস প্রায় এক হাজার ৫২১টি।
শুধু প্রাণীর মৃত্যুর কারণে আর্থিক ক্ষতি প্রায় তিন কোটি ৭৮ লাখ টাকা। খামার ধ্বংস ও পশুখাদ্য নষ্ট হওয়াসহ সব মিলিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতে মোট আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকা—সর্বশেষ হালনাগাদে যা একাই চট্টগ্রাম জেলাতে বেড়ে প্রায় ৬০ কোটি ৬৮ লাখ টাকায় ঠেকেছে। জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম জেলা, তারপর কক্সবাজার (প্রায় দেড় কোটি টাকা), খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান।
গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ৮৫টি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এর মধ্যে বাঁশখালীতে ২২টি, পটিয়ায় ২০টি ও সাতকানিয়ায় ১৫টি গবাদিপশুর খামার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
বন্যার পানিতে প্রায় ১৭ হাজার ৮৪০ থেকে ১৮ হাজার ৪৬৮ টন পশুখাদ্য (খড়, কাঁচা ঘাস ও দানাদার খাদ্য) নষ্ট হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতি ২৪ থেকে ২৫ কোটি টাকার বেশি। খামারিরা জানাচ্ছেন, প্রাণীর মৃত্যুর চেয়েও বড় সংকট এখন পশুখাদ্যের অভাব; বেঁচে থাকা পশুদের খাওয়ানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে ক্ষুরা রোগ, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্যায় সরকারের যত পদক্ষেপ
বন্যায় দুর্গতদের জন্য ত্রাণ তৎপরতায় রাজনৈতিক দলের নেতারা মাঠে না থাকলেও বন্যা শুরুর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ জুলাই বন্যাদুর্গতদের দ্রুত সহায়তার নির্দেশ দেন এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরিস্থিতি চরম আকার ধারণের পর সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন উদ্ধারকাজে নামে।
বন্যায় মারা যাওয়া প্রতিটি গরুর জন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং প্রতিটি ছাগল বা ভেড়ার জন্য ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফসলি জমি, মৎস্য ঘের, গবাদিপশু ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা।
বাঁশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, বন্যা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। সরকারের বরাদ্দ দেওয়া ১৫০ টন চাল ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ব্যক্তি, বিভিন্ন সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী দল আরো ১৫ থেকে ২০ হাজার রান্না করা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করেছে।
সাতকানিয়ার ইউএনও খন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার পরিবার ত্রাণ পেয়েছে। অধিকাংশ এলাকা থেকে পানি নেমে গেলেও অনেক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত এবং কাদায় ঢেকে আছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রাখা, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব করা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

